যাকাত হিসাব করার তরীকা বা পদ্ধতি ও মাসায়েল।যাকাত বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
![]() |
| যাকাত সংক্রান্ত আলোচনা। |
* যে অর্থ / সম্পদে যাকাত আসে সে অর্থ / সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত আদায় করা ফরয । মূল্যের আকারে নগদ টাকা দ্বারা বা তা দ্বারা কোন আসবাব পত্র ক্রয় করে তা দ্বারাও যাকাত দেয়া যায় ।
* যাকাতের ক্ষেত্রে চন্দ্র মাসের হিসেবে বৎসর ধরা হবে । যখনই কেউ নেছাব পরিমাণ অর্থ / সম্পদের মালিক হবে তখন থেকেই তার যাকাতের বৎসর শুরু ধরতে হবে ।
* সোনা রুপার মধ্যে যদি ব্রঞ্জ , রাং , দস্তা , তামা ইত্যাদি কোন কিছুর মিশ্রণ থাকে আর সে মিশ্রণ সোনা রুপার চেয়ে কম হয় তাহলে পুরোটাকেই সোনা রুপা ধরে যাকাতের হিসেব করা হবে- মিশ্রিত দ্রব্যের কোন ধর্তব্য হবে না । আর যদি মিশ্রিত দ্রব্য সোনা রুপার চেয়ে অধিক হয় , তাহলে সেটাকে আর সোনা রুপা ধরা হবে না । বরং ঐ মিশ্রিত দ্রব্যই ধরা হবে ।
* যাকাত হিসেব করার সময় অর্থাৎ , ওয়াজিব হওয়ার সময় সোনা , রুপা , বাবসায়িক পণ্য ইত্যাদির মূল্য ধরতে হবে তখনকার ( ওয়াজিব হওয়ার সময়কার ) বাজার দর হিসেবে এবং সোনা রুপা ইত্যাদি যে স্থানে রয়েছে সে স্থানের দাম ধরতে হবে ।
* শেয়ারের মূল্য ধরার ক্ষেত্রে মাসআলা হলঃ যারা কোম্পানীর লভ্যাংশ ( Dividend ) অর্জন করার উদ্দেশ্যে নয় বরং শেয়ার ক্রয় করেছেন শেয়ার বেচা - কেনা করে লাভবান হওয়া ( Capital Gain ) - এর উদ্দেশ্যে , তারা শেয়ারের বাজার দর ( Market Value ) ধরে যাকাত হিসেব করবেন ।
আর শেয়ার ক্রয় করার সময় যদি মুল উদ্দেশ্য থাকে কোম্পানী থেকে লভ্যাংশ ( Divdend ) অর্জন করা এবং সাথে সাথে এ উদ্দেশ্যও থাকে যে , শেয়ারের ভাল দর বাড়লে বিক্রিও করে দিব , তাহলে যাকাত হিসেব করার সময় শেয়ারের বাজার দরের যে অংশ যাকাত যোগ্য অর্থ / সম্পদের বিপরীতে আছে তার উপর যাকাত আসবে , অবশিষ্ট অংশের উপর যাকাত আসবেনা ।
উদাহরণ স্বরূপ - শেয়ারের মার্কেট ভ্যালূ ( বাজার দর ) ১০০ টাকা , তার মধ্যে ৬০ ভাগ কোম্পানীর বিল্ডিং , মেশিনারিজ ইত্যাদির বিপরীতে , আর ৪০ ভাগ কোম্পানীর নগদ অর্থ , কাঁচামাল ও তৈরী মালের বিপরীতে , তাহলে যাকাতের হিসেব করার সময় শেয়ারের বাজার দর অর্থাৎ , ১০০ টাকার ৬০ ভাগ বাদ যাবে । কেননা সেটা এমন অর্থ / সম্পদের বিপরীতে যার উপর যাকাত আসে না । অবশিষ্ট ৪০ ভাগের উপর যাকাত আসবে ।
* যাকাত দাতার যে পরিমাণ ঋণ আছে সে পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে বাকীটার যাকাত হিসেব করবে । ঋণ পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে যদি যাকাতের নেছাব পূর্ণ না হয় তাহলে যাকাত ফরয হবে না । তবে হযরত মাওলানা মুফতী তাকী উছমানী সাহেব বলেছেনঃ
যে লোন নিয়ে বাড়ি করা হয় বা যে লোন নিয়ে মিল ফ্যাক্টরী তৈরি করা হয় বা মিল ফ্যাক্টরীর মেশিনারিজ ক্রয় করা হয় , এমনিভাবে যে সব লোন নিয়ে এমন কাজে নিয়োগ করা হয় যার মূল্যের উপর যাকাত আসে না -যেমন বাড়ি ও ফ্যাক্টরী বা ফ্যাক্টরীর মেশিনারিজের মূল্যের উপর যাকাত আসে না- এসব লোন যাকাতের জন্য বাধা নয় অর্থাৎ , এসব লোনের পরিমাণ অর্থ যাকাতের হিসাব থেকে বাদ দেয়া যাবে না ।
হাঁ যে লোন নিয়ে এমন কাজে নিয়োগ করা হয় যার মূল্যের উপর যাকাত আসে ; যেমন লোন নিয়ে ফ্যাক্টরীর কাচামাল ক্রয় করল ( এখানে কাঁচামালের মূল্যের উপর যাকাত আসে ) এরূপ ক্ষেত্রে এ লোন পরিমাণ অর্থ যাকাতের হিসাব থেকে বাদ যাবে । মুফতী তাকী উছমানী সাহেব এ মাসআলাটিকে শক্তিশালী যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত করেছেন , অতএব তার মতটি গ্রহণ করার মধ্যেই সতর্কতা রয়েছে ।
* কারও নিকট যাকাত দাতার টাকা পাওনা থাকলে সে পাওনা টাকার যাকাত দিতে হবে । পাওনা তিন প্রকার ( এক ) কাউকে নগদ টাকা ঋণ দিয়েছে কিংবা ব্যবসায়ের পণ্য বিক্রি করেছে এবং তার মূল্য বাকী রয়েছে ।
এরূপ পাওনা কয়েক বৎসর পর উসূল হলে যদি পাওনা টাকা এত পরিমাণ হয় যাতে যাকাত ফরয হয় , তাহলে অতীত বৎসর সমূহের যাকাত দিতে হবে ।
যদি একত্রে উসূল না হয়- ভেঙ্গে ভেঙ্গে উসূল হয় , তাহলে ১১ তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে । এর চেয়ে কম পরিমাণ উসূল হলে তার যাকাত ওয়াজিব হবে না- তবে অল্প অল্প করে সেই পরিমাণে পৌঁছে গেলে তখন ওয়াজিব হবে । আর যখনই ওয়াজিব হবে তখন অতীত সকল বৎসরের যাকাত দিতে হবে । আর যদি এরূপ পাওনা টাকা নেছাবের চেয়ে কম হয় তাহলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে না । ( দুই ) নগদ টাকা ঋণ দেয়ার কারণে বা ব্যবসায়ের পণ্য বাকীতে বিক্রি করার কারণে পাওনা নয় বরং ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাব পত্র , কাপড় - চোপড় ,
চাষাবাদের গরু ইত্যাদি বিক্রয় করেছে এবং তার মূল্য পাওনা রয়েছে- এরূপ পাওনা যদি নেছাব পরিমাণ হয় এবং কয়েক বৎসর পর উসূল হয় তাহলে ঐ কয়েক বৎসরের যাকাত দিতে হবে । আর যদি ভেঙ্গে ভেঙ্গে উসূল হয় তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ না হবে ততক্ষণ যাকাত ওয়াজিব হবে না । যখন উক্ত পরিমাণ উসূল হবে তখন বিগত বৎসর সমূহের যাকাত দিতে হবে । ( তিন ) মহরের টাকা , পুরস্কারের টাকা , খোলা তালাকের টাকা , বেতনের টাকা ইত্যাদি পাওনা থাকলে এরূপ পাওনা উসূল হওয়ার পূর্বে যাকাত ওয়াজিব হয় না । উসূল হওয়ার পর ১ বৎসর মজুদ থাকলে তখন থেকে তার যাকাতের হিসাব শুরু হবে ।
পাওনা টাকার যাকাত সম্পর্কে উপরোল্লিখিত বিবরণ অনুযায়ী হিসাব শুরু হবে । পাওনা টাকার যাকাত সম্পর্কে উপরোল্লিখিত বিবরণ শুধু তখনই প্রযোজ্য হবে যখন এই টাকা ব্যতীত তার নিকট যাকাত যোগ্য অন্য কোন অর্থ / সম্পদ না থাকে । আর অন্য কোন অর্থ / সম্পদ থাকলে তার মাসআলা উলামায়ে কেরাম থেকে জেনে নিবেন
* যে ঋণ ফেরত পাওয়ার আসা নেই - এরূপ ঋণের উপর যাকাত ফরয হয় না । তবে পেলে বিগত সমস্ত বৎসরের যাকাত দিতে হবে ।
* যৌথ কারবারে অর্থ নিয়োজিত থাকলে যৌথভাবে পূর্ণ অর্থের যাকাত হিসাব করা হবে না বরং প্রত্যেকের অংশের আলাদা আলাদা হিসাব হবে ।
* যে সব সোনা রুপার অলংকার স্ত্রীর মালিকানায় দিয়ে দেয়া হয় । সেটাকে স্বামীর সম্পত্তি ধরে হিসাব করা হবে না বরং সেটা স্ত্রীর সম্পত্তি । আর যে সব অলংকার স্ত্রীকে শুধু ব্যবহার করতে দেয়া হয় , মালিক থাকে স্বামী ,
সেটা স্বামীর সম্পত্তির মধ্যে ধরে হিসাব করা হবে । আর যেগুলোর মালিকানা অস্পষ্ট রয়েছে তা স্পষ্ট করে নেয়া উচিত । যে সব অলংকার স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ থেকে তৈরী বা যেগুলো বাপের বাড়ি থেকে অর্জন করে সেগুলো স্ত্রীর সম্পদ বলে গণ্য হবে । মেয়েকে যে অলংকার দেয়া হয় সেটার ক্ষেত্রেও মেয়েকে মালিক বানিয়ে দেয়া হলে সেটার মালিক সে । আর শুধু ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দেয়া হলে মেয়ে তার মালিক নয় ।
নাবালেগা মেয়েদের বিবাহ - শাদী উপলক্ষে তাদের নামে যে অলংকার বানিয়ে রাখা হয় বা নাবালেগ ছেলে কিংবা মেয়ের বিবাহ - শাদীতে ব্যয়ের লক্ষ্যে তাদের নামে ব্যাংকে বা ব্যবসায় যে টাকা লাগানো হয় সেটার মালিক তারা । অতএব এগুলো পিতা / মাতার সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না এবং পিতা / মাতার যাকাতের হিসাবে এগুলো ধরা হবে না । আর বালেগ সন্তানের নামে শুধু অলংকার তৈরী করে রাখলে বা টাকা লাগালেই তারা মালিক হয়ে যায় না যতক্ষণ না সেটা সে সন্তানদের দখলে দেয়া হয় । তাদের দখলে দেয়া হলে তারা মালিক , অন্যথায় সেটার মালিক পিতা / মাতা । ( جواهر الفتاوى جـ / 1 وغيره )
* হিসাবের চেয়ে কিছু বেশী যাকাত দিয়ে দেয়া উত্তম । যাতে কোন রূপ কম হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে । প্রকৃত পক্ষে সেটুকু যাকাত না হলেও তাতে দানের ছওয়াবতো হবেই।
বিশেষ আলোচনা।শিশুর খাৎনা।
মুসলিম শিশুর জন্য পিতামাতার প্রতি আরো কর্তব্য হল উপযুক্ত বয়সে তার খাৎনা করা । পুরুষাঙ্গের সম্মুখ উপরিঅংশের অতিরিক্ত চামড়া কেটে ফেলাকে খাৎনা বলে । খাৎনা করা সুন্নাত । এটি ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্য জ্ঞাপক আমলও বটে । খাৎনা সুন্নাতে ইব্রাহিমী এবং ফিত্রাত - এরও অন্তর্ভুক্ত । রাসুলুল্লাহ্ ( সা ) ইরশাদ করেন : الفطرة خمس الختان . ****** ফিরাত তথা স্বভাবজাত কাজ পাঁচটি । তন্মধ্যে একটি হল খাৎনা করা ** রাসূলুল্লাহ ( সা ) আরো ইরশাদ করেন : عشر من سنن المرسلين الختان والتعطر والسواك والنكاح الخ . দশটি আমল নবী - রাসূলগণের সুন্নাত , ১. খাৎনা করা , ২. আতর ব্যবহার , ৩. মিস্ওয়াক করা , ৪. বিবাহ করা ...
( হাদীসের শেষ পর্যন্ত ) । ** সুন্নাতে খাৎনা প্রাচীনকাল থেকেই একটি অত্যাবশ্যকীয় ধর্মীয় বিধানরূপে প্রচলিত খানার মধ্যে বহু উপকারিতা নিহিত রয়েছে । খানা না করলে বিভিন্ন ধরনের রোগ হতে পারে । ত্বকের ভিতর জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার না করা হলে তা বিষাক্ত হয়ে অনেক সময় ফুটো হয়ে যায় । উপরে ফুটো হলে তাকে বলা হয় ' ফাইমাসিস ' ( Phimosis ) আর নিচে ফুটো হলে তাকে বলা হয় ' প্যারাফাইমাসিস ' ( Paraphimosis ) ।
এ রোগ হলে উপরের বাড়তি চামড়া কেটে না ফেললে চামড়ায় পচন ধরতে পারে । স্ত্রী সহবাসে অসুবিধা হয় । এর ময়লার সাথে জমে থাকা বিভিন্ন রোগ জীবাণু স্ত্রীর জরায়ুতে লেগে নানা রকম রোগ - বালাই দেখা দিতে পারে ।
লিঙ্গের মাথায় মাংস জমে প্রশ্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে বিধায় এ অবস্থায় ক্যান্সারের মত মারাত্মক ব্যাধিও হতে পারে । খাত্না না করালে চামড়ার ভাঁজে প্রশ্রাব ও বীর্য প্রভৃতি আটকে থেকে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে । চিকিৎসকগণের মতে খাৎত্নাবিহীন পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার বেশি হয় এবং এ শ্রেণীর স্বামীদের স্ত্রীদেরও মধ্যে ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায় ।
খাত্মায় ফোরস্কীন বা বাড়তি অপ্রয়োজনীয় চামড়াটুকু পুরুষাঙ্গের মাথা থেকে কেটে ফেলা হয় । ইসলামের খাৎনা বিধান বিজ্ঞানসম্মত এবং জীবনভিত্তিক । তাছাড়া খাত্মাকৃত পুরুষ তার যৌনাঙ্গের অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে পারেন অতি সহজেই ।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ । শিশুর খান্নার সময়কাল অধিকাংশ মুসলিম মনীষীর মতে , শৈশবকালে খাত্না করা সুন্নাত । কেননা কিছুকাল পরেই তাকে শরী'আতের বিধি - নিষেধ পালন করতে হবে । আর সাবালকত্বে পৌঁছার পর সে যেন খাত্নাকৃত অবস্থায় থাকে । অবশ্য কোন অনিবার্য কারণবশত বয়োপ্রাপ্তির পরে করানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও খাৎনা করিয়ে নিতে হবে । খাৎনা যেহেতু ইসলামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং তার পরিচয়জ্ঞাপক আমলও বটে । তাই খাৎনাকে কোন অবস্থাতেই এড়িয়ে চলার অবকাশ নেই ।
অবশ্য বয়োপ্রাপ্তির পর খাত্নাকালে পরপুরুষের সামনে গুপ্তাঙ্গ অনাবৃত করার অনুমতি শুধুমাত্র প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রদান শিশু - কিশোর পরিচর্যায় ইসলাম ১৪৭ করা হয়েছে । তাই খানাকারীর জন্যও প্রয়োজনের অতিরিক্ত সতর দেখা বৈধ হবে না । এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ ( সা ) ইরশাদ করেন : . من اسلم فليختتن وإن كان كبيرا . কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে সে যেন অবশ্যই খাৎনা করিয়ে নেয় , যদিও সে বয়োপ্রাপ্ত হয়ে থাকে । খাত্মার কুসংস্কার।
