হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রাঃ)।রাসুলের (সাঃ) আদরের কন্যার জীবন বৃত্তান্ত। নারীদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
![]() |
| হযরত ফাতিমা রাঃ এর জীবনী। |
ফাতিমাতুয যাহরা রাযিয়াল্লাহু আনহার জন্ম হয়েছিল পবিত্র কা'বার পূণনির্মাণের বছরে , যা ঘটেছিল নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পূর্বে । তাঁর মা যার মধ্যে দূরদর্শিতা , বিচক্ষণতা , উচ্চবংশসহ প্রচুর সৎগুণের পাশাপাশি সমাবেশ ঘটেছিল অগাধ সম্পদের । জাহেলী যুগেই তাকে বলা হত তাহেরা ' বা পবিত্র , তার নামের বিশেষণ ব্যবহৃত হত ' কুরাইশী নারীদের নেত্রী ' ।
তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছিলেন এমন সময় যখন সকল মানুষ তাকে অস্বীকার করেছিল । তিনি তাঁকে মেনে ছিলেন সত্যবাদী বলে যখন মানুষ তাকে আখ্যায়িত করেছিল মিথ্যাবাদী রূপে ।
তিনি নিজের যাবতীয় সম্পদ তাঁর হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন যে সময় সকল মানুষ তাঁকে করেছিল বঞ্চিত । এই হল ফাতিমাতু যাহরা রাযিয়াল্লাহু আনহা এর মা আর তাঁর পিতা ! তিনি ছিলেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন ( রাসূলগণের সর্দার ) খাতামুন নাবীয়্যিন ( সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ) ও ইমামুল মুত্তাকীন ( মুত্তাকীদের আদর্শ ) ।
কী মহৎ এই বংশ ! কতো মহোত্তম এই পিতা ! ফাতিমাতুয যাহরা ছিলেন পিতা মাতার সর্বশেষ সন্তান , শেষ সন্তান। সর্বদাই স্নেহ - মমতার আবেগকে অধিক আলোড়িত করে লালিত হয় সর্বাধিক আদর ও ভালবাসার প্রশ্রয়ে এ কারণেই ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদরের ফুল তিনি খুশি হতেন তাঁকে প্রসন্ন দেখলে , ব্যথিত হতেন তাঁর মুখভারী দেখলে ।
তবে পিতা - মাতার স্নেহ - মমতা প্রতিবন্ধক হয়নি কর্তব্যের বোঝা বহনের জন্য তার প্রস্তুত হওয়া ও উপযুক্ত শিক্ষা - দীক্ষায় গড়ে উঠার পথে বর্ণিত আছে যে , গৃহস্থালী কাজকর্ম তিনি একাই সম্পাদন করতেন , তাকে সহযোগিতা করার কেউ ছিল না ।
ওহোদের যুদ্ধে পিতার জখমে তিনিই ব্যান্ডেজ বেঁধেছেন , তার বয়স যখন বাড়ল এবং সাবালকত্বের পর্যায়ে উপনীত হলেন , অনেকের আগ্রহ সৃষ্টি হল তাঁর প্রতি । তাঁর জন্য বিবাহের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন যারা তাদের তালিকায় ছিলেন আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকেই বিশেষভাবে উক্ত দু'জনকেও ফিরিয়ে দিলেন অত্যন্ত সৌজন্যপূর্ণভাবে । যেন তিনি কামনা করছিলেন তাঁর সঙ্গে নির্ধারিত হোক ‘ আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু'র জীবন ।
* অবশেষে হিজরতের অষ্টম বছরে ' আলী ইবনে আবী তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহু ফাতিমাতুয যাহরাকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম একেবারে যেন লুফে নিলেন সেই প্রস্তাব । ওদিকে ‘ আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন । সিজদা থেকে যখন মাথা উঠালেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন بارك الله لكما و عليكما ، و أسعد جدكما و أخرج منكما الكثير الطيب ( অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদের জীবন বরকত ও রহমত দিয়ে পূর্ণ করে দিন , তোমাদের ভাগ্যে সুখ ও সমৃদ্ধি দান করুন । তোমাদেরকে নেককার ও উত্তম সন্তান দান করুন এবং দান করুন প্রচুর নেক ও উত্তম আমলের তাওফীক । )
' আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন ( মক্কা থেকে হিজরত করে আসা সাহাবীদের মধ্য থেকে ) আবূ বকর , উমর , উসমান , তালহা এবং যুবাইর প্রমুখ মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম । এছাড়া প্রায় একই পরিমাণ আনসার সাহাবীও সেখানে ছিলেন উপস্থিত । সকলে নিজ নিজ আসনে বসার পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ের খুতবা শুরু করলেন ।
তিনি বললেন الحمد لله المحمود بنعمته ، المعبود بقدرته ، إن الله عز و جل جعل المصاهرة نسبا لاحقا ، و أمرا مفترضا و حكما عادلا ، و خيرا جامعا ، أوشج بها الأرحام و ألزمها الأنام ، فقال الله عز و جل " وهو الذي خلق من الماء بشرا فجعله نسبا و صهرا ، و كان ربك قديرا " أشهدكم أني زوجت فاطمة من علي على أربع مئة مثقال فضة إن رضي بذلك على السنة القائمة ، و الفريضة الواجبة ... فجمع الله شملهما و بارك لهما و أطاب نسلهما ... أقول قولي هذا أستغفر الله العظيم . , ( অর্থঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি প্রশংসিত অগণিত নেআমতের কারণে , যিনি মা'বুদ আপন ক্ষমতার কারণে । নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বৈবাহিক সূত্রের সম্পর্ককে করেছেন সংযোজিত বংশ , বিবাহকে বানিয়েছেন অবশ্য পালনীয় , বানিয়েছেন একটি সুসংগত বিধান ও ব্যাপক কল্যাণকর , এর মাধ্যমে আত্মীয়তা ও সম্পর্ককে রেখেছেন প্রতিষ্ঠিত আর মানুষের জন্য একে করে দিয়েছেন বাধ্যতামূলক ।
মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন ( তরজমা ) তিনিই মানবকে সৃষ্টি করেছেন পানি ( বীর্য ) থেকে , অতপর তাকে করেছেন রক্তগত বংশ ও বৈবাহিক সূত্রে সৃষ্ট সম্পর্কশীল । আর তোমার প্রভু সার্বিক ক্ষমতাবান । ' আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে চারশত মেছকাল ( ১৩১ ভরি ) রূপার মোহরের ভিত্তিতে আমার মেয়ে ফাতিমাকে ' আলী ইবনে আবী তালেবের সঙ্গে তার সম্মতিতে ; প্রতিষ্ঠিত রীতি ও অপরিহার্য কর্তব্যের আলোকে বিবাহ প্রদান করলাম আল্লাহ তা'আলা তাদের জোড়াকে , সম্পর্ক ও বন্ধনকে অটুট রাখুন , তাদের দু'জনের জীবনে বরকত দান করুন , উৎকৃষ্ট বংশধর তাদেরকে দান করুন।মুসলিম নারীদের নেত্রীকে স্বামীগৃহে সম্প্রদান করা হল অথচ উল্লেখযোগ্য কোন সরঞ্জামই ছিল না তাঁর । সামান্য যে আসবাবগুলো তাঁর সঙ্গে পাঠানো হল তা ছিল
- টানা রশির একটি খাট , একটি আঁশভর্তি চামড়ার বালিশ , একটি চামড়ার তৈরী ( গামলাজাতীয় ) বাসন , একটি পানপাত্র , একটি চালনা , একটি গামছা বা রুমাল , একটি চকমকি পাথর ( যা ঘষে আগুন জ্বালানো হত ) , জাঁতাকলের দুইটি চাকা আর দু’টি কলস । ** প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমাতুয যাহরা রাযিয়াল্লাহু আনহার এই দূরত্বের কষ্ট সইতে পারলেন না । ফলে তিনি মনস্থ করলেন তাঁকে নিজের আশপাশে ফিরিয়ে আনবেন ।
তাঁর আশপাশের বাড়িঘর ছিল হারেসা ইবনে নু'মানের । তিনি ছুটে আসলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে । তিনি হৃদয়ের সবখানি আবেগ উজাড় করে দিয়ে বললেন , আমি শুনতে পেলাম , আপনি ন ফাতিমাকে নিজের কাছাকাছি নিয়ে আসতে চান । এই যে দেখছেন আশপাশের এই সব বাড়ীই আমার , এগুলোই আপনার সবচেয়ে কাছের । আর আমি নিজে ও আমার সব মাল আল্লাহর জন্য এবং তাঁর রাসূলের জন্য উৎসর্গীত । ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আল্লাহর কসম- আমার যেই সম্পদটুকু আমার থেকে আপনি দয়া করে গ্রহণ করবেন , সেটা বাকি সম্পদের চেয়ে আমার কাছে বেশি পছন্দনীয় । | রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সমর্থন করে বললেন তোমার বক্তব্য সত্য ও সঠিক , একদম খাঁটি তোমার ভালবাসা । আল্লাহ কবুল করুন এবং তোমার জীবনে বরকত দান করুন । তিনি ফাতিমাকে নিয়ে আসলেন নিজের খুব কাছে এবং তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করলেন হারেসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি বাড়িতে ।
*** যখন থেকে ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা তাঁর পিতার পাশে বসবাস শুরু করলেন তখন থেকেই প্রতিদিন প্রভাতে তিনি মেয়ের বাড়ী যেয়ে হাজির হতেন । যখন ফজরের আযান হত তখন দরজার কড়া নেড়ে বলতেন ( অর্থঃ হে গৃহবাসী ! আস্সালামু আলাইকুম , আল্লাহ তোমাদের পবিত্র করুন , উঠে পড় ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সফর থেকে ফিরতেন তখন প্রথমে যেতেন মসজিদে , সেখানে দু'রাকাআত নামায আদায় করতেন । দ্বিতীয় পর্যায়ে যেতেন ফাতিমার গৃহে , সেখানের অবস্থান দীর্ঘায়িত করতেন এরপর যেতেন স্ত্রীদের গৃহে ।
*** মুহাম্মাদ ইবনে কয়েস থেকে বর্ণিত আছে যে , একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক সফরে বের হলেন , তাঁর সেই সফরের সঙ্গী ছিলেন ‘ আলী ইবনে আবী তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহু । তাঁদের দু'জনের অনুপস্থিতির অবসরে ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা প্রস্তুত করলেন দু’টি বালা , একটি গলার হার ও দু'টি দুল আর দরজায় ঝুলিয়ে দিলেন একটি সুন্দর পর্দা । এসবই করলেন পিতা ও স্বামীর গৃহে প্রত্যাবর্তনের খুশিতে ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ফিরে এলেন তখন সাক্ষাত করতে গেলেন ফাতিমার সঙ্গে । বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকলেন তার সাহাবীরা । মেয়ের কাছে তাঁর দীর্ঘ অবস্থানের কারণে তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না যে ফিরে যাবেন নাকি অপেক্ষা করবেন । এমনি মুহূর্তে বের হয়ে আসলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । তাঁর চেহারায় ফুটে উঠেছিল রাগের চিহ্ন । তিনি গিয়ে বসলেন মিম্বরে । ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা বুঝতে পারলেন যে তাঁর পিতা রুষ্ট হয়েছেন ঐ বালা , হার , দুল ও পর্দা দেখে তখন তিনি সব অলঙ্কার খুলে ফেললেন , পর্দা নামিয়ে ফেললেন এবং পাঠিয়ে দিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে । বাহককে বলে পাঠালেন যে , রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলবে - السلام عليكم أهل البيت و يطهركم تطهيرا
আপনার মেয়ে সালাম দিয়েছে এবং এগুলো আল্লাহর জন্য বিলিয়ে দিতে বলেছে । বাহকের মুখে সবকথা শুনে তিনি বললেন قد فعلت ـ فداها أبوها ـ ليست الدنيا من محمد ولا من آل محمد ، و لو كانت الدنيا تعدل عند الله من الخير جناح بعوضة ما سقى كافرا منها شربة ماء . অর্থঃ অবশেষে সে সঠিক কাজটিই করল । তার পিতা তার জন্য উৎসর্গীত । আসলে দুনিয়ার চাকচিক্য মুহাম্মাদ ও তার পরিবারের জন্য নয় । দুনিয়া ও দুনিয়ার সুখ - শান্তি যদি আল্লাহর কাছে একটি মাছির পাখার পরিমাণ মূল্যবানও হত তাহলে ( আল্লাহ শুধু তাঁর নেকবান্দাদেরকেই সুখ - সমৃদ্ধি দান করতেন এবং ) কোন কাফেরকে এক ঢোক পানিও পান করতে দিতেন না ।
ফাতিমাতুয যাহরার গৃহ অতি শীঘ্র লাভ করল নেককার সন্তান - সন্ততির সুখ ও সৌভাগ্য । এই মহান পিতা - মাতাকে দান করা হল হাসান , হুসাইন ও মুহসিন অর্থাৎ তিন পুত্র আর দুই কন্যা যায়নাব ও উম্মে কুলসূম ।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশাল সুখানুভূতি আবর্তিত ছিল এই সব সন্তানকে ঘিরে । জানা যায় যে , হাসানের জন্ম হলে পিতা - মাতা তার নাম রেখেছিলেন ' হারব্ ' । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বললেন কোথায় আমার পুত্র ? জলদি নিয়ে এসো । প্রচণ্ড খুশিতে নাতিকে কোলে নিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা কী নাম রেখেছ এর ? ‘ হারব্ ’ । তাঁরা উত্তর দিলেন । উঁহুঁ , হলো না , ওর নাম হবে ' হাসান ' ।
*** রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার সন্তানদের প্রচুর সোহাগ করতেন , শিশুদের মত কথা বলে , শিশুসুলভ কাজ করে ঘনিষ্ঠ হতেন তাদের , তিনি তাদের সঙ্গে কৌতুক করতেন , করতেন রসিকতা , তাদেরকে নাচাতেন।তাদের কেউ নানাজীর ঘাড়ে চড়ে বসত তিনি তখন বিলম্বিত করতেন নামায , দীর্ঘ করতেন সেজদা যেন তাকে নামিয়ে দিতে না হয় । তাঁর অভ্যাস ছিল মাঝে মাঝে ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার গৃহে রাত কাটানোর ; তখন তিনি তাঁর ছেলে - মেয়েদের দেখা - শোনা করতেন একাই । পিতা - মাতাকে ছুটি দিয়ে নিজেই তিনি করতেন ওদের সব খেদমত ।
একরাতে তিনি শুনতে পেলেন হাসান পানি চাচ্ছে , তিনি উঠে পড়লেন এবং মশক থেকে পানি ঢালতে লাগলেন তখন হুসাইনও পানির জন্য হাত বাড়িয়ে দিল , তার হাত সরিয়ে তিনি প্রথমে পান করালেন হাসানকে । এটা দেখে ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন তাহলে কি হাসানই আপনার বেশি প্রিয় ? তিনি বললেন তা কেন হবে ?
তাকে প্রথমে দিলাম কারণ সেই প্রথমে চেয়েছিল । *** ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা যখন সাক্ষাৎ করতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে , তখন তিনি মেয়ের হাত ধরে স্বাগত জানাতেন ।
তাকে নিয়ে বসাতেন নিজের আসনে আর যখন তিনি যেতেন মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য , তিনি উঠে পড়তেন পিতার সম্মানে , তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে তাঁর হাত ধরে সেখানে চুমু দিতেন । অল্প তিনি পিতার কাছে হাজির হলেন মুমূর্ষু অবস্থায় । মেয়েকে কাছে ডেকে কানের কাছে কিছু একটা বললেন , তাতে তিনি কেঁদে উঠলেন সময় পরে তিনি আবারও তাঁর কানে কানে কিছু বললেন এবার আর কাঁদলেন না বরং তার চেহারায় ফুটে উঠল মিষ্টি হাসির আভাস । হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন আর মনে মনে চিন্তা করছিলেন—
' আমি এতদিন মনে করতাম অন্যদের চেয়ে এই মেয়েটির বিশেষ মর্যাদা আছে , ব্যক্তিত্ব আছে , দেখছি সেও অন্যদের মতই । এই দেখি কাঁদে এই দেখি হাসে । ' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত হয়ে গেলে , তিনি একদিন ফাতিমার কাছে ঐ কান্না ও হাসির রহস্য জানতে চাইলেন ।
ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা জবাব দিলেন প্রথমবার কানে কানে জানালেন তিনি ইন্তেকাল করবেন , শুনে আমি কেঁদেছিলাম দ্বিতীয়বার কানে কানে আমাকে জানালেন তাঁর পরিবার থেকে সর্ব প্রথম আমিই তাঁর সঙ্গে মিলিত হব আখিরাতে , এতে আমি খুশি হয়ে হেসেছিলাম ।ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা পিতার ইন্তেকালের পর আর বেশিদিন অপেক্ষা করেন নি , অল্প কয়েকমাসের মধ্যেই চলে গেলেন চিরতরে এই পৃথিবী ছেড়ে , মিলিত হলেন নিজের পিতার সঙ্গে । কেউ বলেন- অল্প কয়েক মাস মানে ছয়মাস , কেউ বলেন তিন , কেউ বলেন দুইমাস ।
হিজরতের একাদশ বর্ষে ফাতিমাতুয যাহরা রাযিয়াল্লাহু আনহা আপন প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিলেন , তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন পিতার সঙ্গে দ্রুত এই সংযুক্তিতে । তাঁর মৃত্যু যখন নিকটবর্তী হল , তিনি নিজ হাতে নিজের গোসল করলেন এবং আসমা বিনতে উমায়েসকে বললেন আমার নতুন পোশাক এনে দাও ,
তিনি পরলেন সেগুলো আর বললেন আমি গোসল সেরে ফেলেছি , কেউ যেন আমার কাফন উন্মুক্ত না করে তিনি একটুখানি মুচকি হাসলেন , পিতার ইন্তেকালের পর তাকে কেউ কখনো হাসতে দেখেনি কেবল ঐ মুহূর্তটি ছাড়া যখন তিনি প্রাণত্যাগ করেন । আল্লাহ ! তুমি বিস্তীর্ণ রহমতের বর্ষণ কর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্নেহ - ভালবাসার ফুল ফাতিমার প্রতি , তাঁকে বধূর বেশে ‘ আলী রযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পাঠানো হয়েছিল রমযান মাসে আবার জান্নাতেও পাঠানো হলো রমযান মাসেই ।
বিশেষ আলোচনা। সৃষ্টি রহস্য।
আসমান - যমীন এর দু'য়ের মাঝে আমাদের জ্ঞাত - অজ্ঞাত যত কিছু আছে সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ্ । মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর মহিমা প্রকাশের লক্ষ্যে এ মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেন ।
তিনি আসমান - যমীন এবং এর মধ্যস্থিত সবকিছুকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন । ইরশাদ হয়েছে : هو الذي خلق السموات والأرض وما بينهما في ستة أيام - আল্লাহ্ , যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এর অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন । ( সূরা সাজদা , ৩২ : ৪ ) বস্তুত এ নিখিল বিশ্বে রয়েছে আসমান - যমীন , পাহাড় - পর্বত , নদী - নালাসহ অসংখ্য সৃষ্টিরাজি ।
আল্লাহ্ তা'আলা ভাসমান চন্দ্র - সূর্য , গ্রহ - নক্ষত্র ও অসংখ্য তারকা দ্বারা আসমানকে সুসজ্জিত করেছেন । এই সুসজ্জিত আসমান আল্লাহ্ তা'আলার কুদ্রতের এক বিশেষ নিদর্শন । বিস্তৃত ও বিশাল পৃথিবীকে বিন্যাস করেছেন তিনি বৈচিত্র্যময় পাহাড় - পর্বত , খাল - বিল , নদী - নালা , সাগর - মহাসাগর ও সারি সারি বৃক্ষ ও তৃণলতার সমারোহে ।
এতে রয়েছে মানুষসহ হাজারো রকমের জীব - জানোয়ার ও পশুপাখি । মানুষের পুষ্টি ও তৃপ্তির জন্য আল্লাহ্ তা'আলা এ স্থলভূমিতে হরেক রকমের খাদ্যশস্য ও সবজির আবাদ করে পৃথিবীকে বসবাস উপযোগী করে দিয়েছেন আমাদের জন্য । জলভাগ : খাল - বিল , নদ - নদী ও সাগর - মহাসাগরে রয়েছে মাছের ও জলজ প্রাণীর প্রাচুর্য । পানির তলদেশে রয়েছে মণি - মুক্তাসহ অফুরন্ত রত্ন ভাণ্ডার । ভূগর্ভে রয়েছে অফুস্ত পানি ও স্বর্ণ - রৌপ্যের অমূল্য সম্পদ । এমনি করে হাজার হাজার মাখলূক আল্লাহ্ তা'আলা সৃষ্টি করেছেন ।
এ সবের মধ্যে মানুষই হল সৃষ্টির সেরা , আশরাফুল মাখলুকাত । সকল সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে আল - বুদ্ধি ও বিবেক - বিবেচনার এক স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছেন । তাই স্বভাবতই তাদের মনে প্রশ্ন জাগে যে , এসব সৃষ্টির পেছনে আল্লাহ্র রহস্য কী ?
কেন তিনি এ সব কিছু সৃজন করেছেন ? এ সব প্রশ্নের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন । কারো কারো মতে এ বিশ্বপ্রকৃতি আল্লাহর ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র । আসমান - যমীন এবং এর মধ্যস্থিত যত কিছু আছে এসব কিছু সৃষ্টি করার হিক্মাত হল , তাঁর সত্তা ও গুণাবলী এবং মা'রিফাতের প্রকাশ । গোটা সৃষ্টি যেন তাঁর তাসবীহ্ - তাহলীল , ইবাদত - বন্দেগীতে নিয়োজিত হয়ে তাঁর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে ।
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে : ربنا الذي أعطى كل شيء خلقه ثم هدى . আমাদের প্রতিপালক তিনি , যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি দান করেছেন । এরপর পথপ্রদর্শন করেছেন ।
( সূরা তাহা , ২০ : ৫০ ) প্রত্যেক বস্তুই নিজ নিজ স্বভাব ও প্রকৃতি অনুযায়ী আল্লাহর তাসবীহ , তাহলীল ও ইবাদত - বন্দেগী করে যাচ্ছে । আরো ইরশাদ হয়েছে : يسبح لله ما في السموات وما في الأرض له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير . আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আগে সমস্তই আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে , আধিপত্য তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান ( সূরা তাগাবুন , ৬৪ : ১ ) আশ্রাফুল মাখলুকাত মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : وما خلقت الجن والانس الا ليعبدون . . আমি জিন এবং মানুষকে সৃষ্টি করেছি এ জন্যই যে , তারা আমারই ইবাদত করবে ।
