জানাযা নামাযের বিবরণ। জানাযা বহন করার মোস্তাহাব তরীকা। জানাযা সংক্রান্ত জরুরী আলোচনা।

 জানাযা নামাযের বিবরণ। জানাযা বহন করার মোস্তাহাব তরীকা।জানাযা সংক্রান্ত জরুরী আলোচনা। 

জানাযার নামাজ। 


* জানাযা নামাযে মাইয়েত সামনে থাকা শর্ত । গায়েবানা জানাযা নামায হানাফী মাযহাবে জায়েয নেই । 

* কেবলামুখী হয়ে এবং দাঁড়িয়ে জানাযার নামায পড়তে হবে । ( এ দু'টো ফরয ) 

* ইমামের জন্য মাইয়েতের সীনা বরাবর দাঁড়ানো সুন্নাত । মুক্তাদীগণের কাতার তিনটা হওয়া মুস্তাহাব । 

* নিয়ত করা ফরয । কারও কারও মতে নিয়তের মধ্যে মাইয়েত পুরুষ না মহিলা , ছেলে না মেয়ে তা - ও নির্ধারিত করা জরুরী । 

* আরবীতে নিয়ত এভাবে করা যায়ঃ نويت أن أصلي الجنازة لله تعالى ودعاء للميت ۔ ( بہشتی گوہر ) 

* বাংলায় নিয়ত এভাবে করা যায়ঃ আল্লাহর ওয়াস্তে এই মাইয়েতের জন্য দুআ করার উদ্দেশ্যে জানাযা নামাযের নিয়ত করছি । 

* নিয়ত করার পর নামাযের তাকবীরে তাহরীমার ন্যায় হাত উঠাবে 

* তারপর আল্লাহু আকবার বলবে ( এটা ফরয ) । ইমাম আল্লাহু আকবার ও সালাম জোরে এবং মুক্তাদী আস্তে বলবে । অন্যান্য সবকিছু সকলেই আন্তে পড়বে । 

* আল্লাহু আকবার বলে নামাযের ন্যায় উভয় হাত বাঁধবে I 

* অতঃপর ছানা পড়বে ( এটা সুন্নাত ) । । ছানা পড়া শেষে আল্লাহু আকবার বলবে হাত উঠানো ব্যতীত । ( এই তাকবীর বলা ফরয । ) 

* অতঃপর দুরূদ শরীফ পড়বে ( এটা সুন্নাত ) । নামাযের দুরূদ পড়া উত্তম । * অতঃপর পূর্বের ন্যায় আল্লাহু আকবার বলবে । ( এই তাকবীরও ফরয ) 

* অতঃপর দুআ পড়বে ( এটা সুন্নাত ) । 

* মাইয়েত বালেগ পুরুষ বা বালেগা নারী হলে নিম্নোক্ত দুআ পড়বে اللهم اغفر لحينا وميتنا وشاهدنا وغائبنا وصغيرنا وكبيرنا وذكرنا وانثانا اللهم من أحييته منا فاحيه على الإسلام ، ومن توفيته منا فتوفه على الإيمان ۔ এর সাথে নিম্নোক্ত দুআটি পড়াও উত্তম । এ দুআটিও হাদীছে বর্ণিত হয়েছে ।


اللهم اغفر له وارحمه وعافه واعف عنه واكرم نزله ووسع مدخله واغسله بالماء والثلج والبرد ، ونقه من الخطايا كما ينقى الثوب الأبيض من الدنس ، وأبدله دارا خيرا من داره واهلا خيرا من أهله وزوجا خيرا من زوجه ، وأدخله الجنة واعذه من عذاب القبر وعذاب * মাইয়েত নাবালেগ ছেলে হলে নিম্নোক্ত দুআ পড়বে اللهم اجعله لنا فرطا واجعله لنا أجرا وذخرا واجعله لنا شافعا ومشفعا ۔ * আর মাইয়েত নাবালেগা মেয়ে হলে নিম্নোক্ত দুআ পড়বে اللهم اجعلها لنا فرطا واجعلها لنا أجرا وذخرا واجعلها لنا شافعةً * দুআ পড়ার পর পূর্বের ন্যায় আল্লাহু আকবার বলবে ( এটা ফরয ) । 

* অতঃপর উভয় হাত ছেড়ে দিয়ে প্রথমে ডান দিকে তারপর বাম দিকে সালাম ফিরাবে । 

* উভয় সালাম ফিরানোর পর হাত ছাড়া যায় কিংবা ডান দিকের সালামের পর ডান হাত এবং বাম দিকের সালামের পর বাম হাত ছাড়া যায় । 

* নামাযে জানাযার পর সাথে সাথে সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে দুআ করা মাকরূহ ও বিদআত ।  

* জুতা খুলে মাটিতে দাঁড়িয়ে নামাযে জানাযা পড়া উত্তম । অবশ্য দাঁড়ানোর স্থান এবং জুতা পাক হলে জুতা পরেও নামায পড়া যায় । আর জুতা খুলে জুতার উপর দাঁড়িয়ে নামায পড়ার ইচ্ছা হলে জুতার উপরিভাগ পাক হওয়া শর্ত ।


 কাফন - দাফনের মাসায়েল। কীভাবে কাফন পরাবেন ও দাফন করবেন।

* জানাযার জন্য একাধিক লাশ একত্রিত হলে প্রত্যেকের জানাযা পৃথক পৃথক আদায় করা উত্তম । সে ক্ষেত্রে যাকে অধিক নেককার বলে মনে হয় তার জানাযা আগে পড়া ভাল । একত্রেও আদায় করা যায় । সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের লাশ থাকলে পুরুষের লাশ ইমামের সন্মুখে , তারপর ছোট বাচ্চাদের , তারপর বয়স্কা মহিলাদের , তারপর নাবালেগা মেয়েদের- এই তারতীবে লাশ রাখবে । 

* যদি ওলীর অনুমতি এবং শিরকাতে জানাযার জামা'আত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে তাহলে পুনর্বার জানাযার নামায পড়া মাকরূহ এবং তা শরী'আত সম্মত নয় । ওলীর অনুমতি ও শিরকাত ব্যতীত প্রথমে জানাযা হয়ে থাকলে ওলী দ্বিতীয় বার জামাআত করতে পারে । সেক্ষেত্রেও প্রথমবার যারা জানাযায় শরীক হয়েছে দ্বিতীয়বার তারা শরীক হতে পারবে না । 

* কোন কোন স্থানে লাশ সম্মুখে রেখে লোকটা কেমন ছিল প্রশ্ন করা হয় আর উপস্থিত লোকেরা বলে ভাল ছিল , শরী'আতে এরূপ বলার কোন ভিত্তি নেই । (জানাযা বহন করার নিয়ম সমূহ

 * মাইয়েত দুধের শিশু বা হাতে হাতে বহনযোগ্য ছোট হলে পর্যায়ক্রমে হাতে হাতে তাকে বহন করে নিয়ে যাবে । আর বড় হলে কোন খাটিয়া প্রভৃতিতে শুইয়ে নিয়ে যাবে , মাথা সামনের দিকে থাকবে । 

* খাটিয়ার চার পায়াকে চার জনে উঠাবে । 

* খাটিয়ার পায়াকে হাত দ্বারা উঠিয়ে কাঁধের উপর রাখবে । 

* কবরস্থান দূর ইত্যাদি কোন ওজর না থাকলে জানাযা গাড়ী বা সওয়ারীতে উঠিয়ে নেয়া মাকরূহ । 



জানাযা বহন করার মোস্তাহাব তরীকা।কীভাবে লাশ বহন করবেন।


* প্রথমে মাইয়েতের ডান দিকের সম্মুখ পায়া হাত দিয়ে নিজের ডান কাঁধে উঠিয়ে কমপক্ষে দশ কদম চলবে । অতঃপর ঐদিকের পিছনের পায়া ডান কাঁধে রেখে কম পক্ষে দশ কদম চলবে । তারপর মাইয়েতের বাম দিকের সম্মুখের পায়া বাম কাঁধে রেখে দশ কদম , তারপর পশ্চাতের পায়া অনুরূপ বাম কাঁধে রেখে দশ কদম চলবে । 

* জানাযা নিয়ে দ্রুত কদমে চলা সুন্নাত । তবে দৌড়ে নয় কিংবা খুব দ্রুত নয় । 

* সঙ্গীরা জানাযার ডানে বায়ে নয় বরং পশ্চাতে চলবে । 

* সঙ্গীদের পায়ে হেটে চলা মোস্তাহাব । কোন বাহনে থাকলেও জানাযার পশ্চাতে চলবে । 

* জানাযা বহনকারী ও সঙ্গীগণ কোন দু'আ , যিকির শব্দ করে পড়বে না । শব্দ করা মাকরূহ । 

* জানাযা কাঁধ থেকে রাখার পূর্বে কেউ বসবে না । 

* জানাযার সাথে চলার সময় কোন কথা বলবে না ।



বিশেষ আলোচনা। নাজাসাত ও এর প্রকারভেদ।

 ' নাজাসাত ' অর্থ অপরিত্রতা । পবিত্রতার বিপরীত । মানুষ বা জীব - জন্তুর শরীর থেকে যে ময়লা বা নাপাক বস্তু বের হয় , একে শরী'আতের পরিভাষায় ' নাজাসাত ' বলা হয় । হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহলভী ( র ) বলেন , নাজাসাত বলতে এমন বস্তুকে বোঝায় যাকে সুস্থ প্রকৃতির মানুষ অপবিত্র মনে করে তা পরিহার করে এবং কাপড়ে লাগলে ধুয়ে ফেলে । যেমন , মল - মূত্র , রক্ত ইত্যাদি । নাজাসাত দুই প্রকার – নাজাসাতে হাকীকী ও নাজাসাতে হুক্ষ্মী ।


 নাজাসাতে হাকীকী : নাপাকীর এমন এক অবস্থা যা দেখা যায় এবং যা সাধারণত মানুষের মনে ঘৃণার উদ্রেক করে এবং সেসব নাপাকী থেকে মানুষ নিজের শরীর , জামা - কাপড় ও অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রকে রক্ষা করতে চায় । 


যেমন , মল - মূত্র , বীর্য , রক্ত , মদ ইত্যাদি । * নাজাসাতে হুক্মী : নাপাকীর এমন এক অবস্থা যা দৃশ্যমান নয় , বরং শরী'আতের মাধ্যমে তা জানা যায় । যেমন উযূহীন অবস্থায় থাকা , গোসলের প্রয়োজন হওয়া । নাজাসাতে হুক্ষ্মীকে হাদাসও বলা হয় । 


উল্লেখ্য যে , উভয় প্রকারের নাপাকী হতে শরীর পাক থাকা আবশ্যক নাজাসাতে হাকীকী আবার দুই প্রকার , নাজাসাতের গালীযা এবং নাজাসাতে খাফীফা । নাজাসাতে গালীযা : মানুষের মল - মূত্র , রক্ত , মুখভর্তি বমি , বীর্য , পেশাব - পায়খানার রাস্তা দিয়ে নির্গত যে কোন তরল বস্তু , মদ , হারাম পশুর পেশাব - পায়খানা ও দুধ , শূকরের গোশত , পশম , হাড়সহ সবকিছু , হালাল পশুর পায়খানা এবং হাঁস , মুরগী , পানকৌড়ি ও তিতিরের পায়খানা , পশুর রক্ত , ক্ষতস্থান থেকে নির্গত পুঁজ অথবা অন্য কোন তরল পদার্থ , নাপাক বস্তু থেকে নিঃসৃত নির্যাস , সকল পশুর পায়খানা , রক্ত , মৃত পশুর গোশ্ত , চর্বি ইত্যাদি এবং দাবাগাতহীন চামড়া নাজাসাতে গালীযা । তরল নাজাসাতে গালীযা শরীর বা কাপড়ে লাগলে তা এক দিরহাম তথা হাতের তালুর পরিমাণ হলে মাফ । আর গাঢ় হলে ওজনে সাড়ে চার মাশা পরিমাণ মাফ । বর্ণিত পরিমাণের অতিরিক্ত হলে উভয় ক্ষেত্রেই তা ধৌত করা ব্যতিরেকে পাক হবে না । 


* নাজাসাতে খাফীফা : নাজাসাতে খাফীফা নাজাসাতে গালীযার তুলনায় হালকা ও লঘু নাজাসাতে থাকীফা যে স্থানে লাগে তার এক - চতুর্থাংশ পরিমাণ হলে তা মাফ । কাপড়ের যে স্থানে নাপাকী লাগে তার এক - চতুর্থাশ যেমন কাপড়ের আঁচল , জামার হাতা ইত্যাদি , অথবা শরীরের যে অঙ্গে নাপাকী লাগে তার এক - চতুর্থাংশ যেমন , হাত , পা ইত্যাদি । 


মাইয়েতকে গোসল প্রদানের তরীকা। পুরুষ এবং মহিলার কাফন পরিধান করানোর নিয়ম।


গরু - মহিষ ইত্যাদি হালাল পশুর পেশাব , কাক চিল ইত্যাদি হারাম পাখির মল , হালাল পাখির পায়খানা যদি দুর্গন্ধযুক্ত হয় । ২০ নাজাসাতে হুক্মী : নাজাসাতে হুক্ষ্মী দুই প্রকার , হাদাসে আসগার বা ছোট নাপাকী এবং হাদাসে আকবার বা বড় নাপাকী । হাদাসে আসগার বলতে ঐ সব অবস্থা বুঝায় যার কারণে উযূ থকে না । 


হাদাসে আসগারের হুকুম হাদাসে আসগার থেকে পবিত্র হতে হলে উযূ করতে হবে । পানি পাওয়া না গেলে অথবা পানি ব্যবহার ক্ষতিকারক হলে তায়াম্মুম দ্বারাও পবিত্র হওয়া যায় । উক্ত হাদাস অবস্থায় নামায আদায় করা যাবে না । কুরআন স্পর্শ করা যাবে না । তবে বিনা উযূতে অর্থাৎ হাদাসে আসগার অবস্থায় মৌখিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা যায় । হাদাসে আকবারের হুকুম হাদাসে আকবার বলতে ঐ সব অবস্থা বুঝায় যার কারণে গোসল ফরয হয় । এ হাদাস থেকে পবিত্র হতে হলে গোসল করতে হয় । গোসল করা সম্ভব না হলে তায়াম্মুম দ্বারাও পাক।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post