ইয়াজুয ও মাজুয নামক দু'টি অত্যাচারী গোত্রের আবির্ভাব।ভয়ংকর যে অবস্থা হবে।
![]() |
| ইয়াজুয মাজুয। |
কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার অপর একটি বড় আলামত হল পৃথিবীতে ‘ ইয়াজুয - মাজুয ’ নামক দু'টি চরম অত্যাচারী গোত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে । হযরত ঈসা ( আঃ ) এর অবতরণের পর এ জাতিদ্বয়ের প্রকাশ ঘটবে । হযরত কাতাদা ( রাঃ ) বলেন , ইয়াজুয - মাজুয আকৃতিতে মানুষের মতই হবে এবং হযরত নূহ্ ( আঃ ) এর পুত্র ইয়াকা এর বংশধর থেকে হবে । ( ফাহুল বারী , ৬ ষ্ঠ খন্ড ) ।
তারা পৃথিবীর উত্তর - পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা হবে । তাফসীরে তাবারী গ্রন্থে বর্তমানের আরমেনিয়া ও আযারবাইজানের পর্বতমালার পাশাতবাগ তাদের আবাসস্থল উল্লেখ করা হয় ( তাবারী , ১৬-২ ) । হযরত যুলকারনাইন কর্তৃক তাদের আগমন পথে সুউচ্চ প্রাচীর নির্মাণ করে দেওয়ার কারণে তারা সাধারণ লোকালয় পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয় না ।
কিয়ামতের পূর্বে উক্ত প্রাচীর ভেঙ্গে যাবে । ফলে তারা স্রোতের ন্যায় বেরিয়ে এসে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়বে । ইরশাদ হয়েছে , حتى إذا فتحت يأجوج ومأجوج وهم من كل حدب ينسلون এমন কি ইয়াজুয ও মাজুযকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং তারা প্রতি উচ্চভূমি থেকে ছুটে আসবে ( ২১ ঃ আম্বিয়া ৯৬ নং আয়াত ) । পূর্বে তারা লোকালয়ে এসে মানুষের উপর নির্যাতন চালাত ও লুটতরাজ করতে । যুলকারনাইন বাদশাহ্ প্রাচীর নির্মাণ করে তাদের আগমনী পথ বন্ধ করে দেন । ইয়াজুয - মাজুয সম্পর্কে কোরআন " তারা বলল , হে যুলকারনাইন ইয়াজ্য ও মাজ্য পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে ।
আমরা কি তোমাকে এ শর্তে কর দিতে পারি যে , তুমি আমাদের ও তাদের মাঝে একটি প্রাচীর গড়ে দিবে ? যুলকারনাইন বলল , আমার প্রভৃ আমাকে যে ক্ষমতা দান করেছেন তাই উৎকৃষ্ট ও উত্তম । সুতরাং তোমরা আমাকে কেবল শ্রম দিয়ে সাহায্য কর । আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যস্থলে একটি মযবুত প্রাচীর গড়ে দিব । তারপর তিনি বললেন , তোমরা আমার নিকট লৌহপিড সমূহ নিয়ে এসো । অতঃপর মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে যখন লোহা স্তুপ স্থাপন দু’পর্বতের সমান হল । তখন তিনি বললেন , তোমরা হাপরে দম দিতে থাক । তখন তা আগুনের মত উত্তপ্ত হলে তিনি বললেন , তোমরা গলিত তামা আন আমি তা এর উপরে ঢেলে দিচ্ছি ।
এরপর থেকে ইয়াজ্য ও মাজ্য আর সে প্রাচীর অতিক্রম কিংবা ভেদ করতে সক্ষম হল না । যুলকারনাইন বললেন যে , এটি হল আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ । যখন তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে তখন তিনি এটি চূর্ণ - বিচূর্ণ করে দিবেন । আর আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য । সে দিন আমি তাদেরকে এমতাবস্থায় ছেড়ে দিব যে , একদল অপর দলের উপর তরঙ্গের ন্যায় পতিত হবে । এবং সিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে , তারপর আমি তাদের সকলকে একত্রিত করব " ( ১৮ঃ কাহফ ৯৪-৯৯ নং আয়াত ) । ২৪
ইয়াজুজ - মাজুজের আকৃতি প্রকৃতি।
ইয়াজুজ - মাজুজ দেখতে মানুষ , তবে স্বভাব হবে চতুষ্পদ জন্তুর মত । দেহের সম্মুখ ভাগ মানুষের ন্যায় এবং পিছনের ও নিম্নের দিক চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় । দুনিয়ার এক সীমান্তে এরা বাস করে । এরা মানুষ , বৃক্ষলতা সব ভক্ষণ করে । এক সময় তারা মানব জাতির উপর অত্যাচার চালাত । হযরত শাহ সেকান্দার , সূদৃঢ় প্রাচীর গেঁথে ইয়াজূজ - মাজূজ জাতিকে মানব এলাকায় আসার পথ বন্ধ করে দেন । ওরা উক্ত প্রাচীর প্রত্যেক দিন জিহ্বা দিয়ে চাটতে থাকে ।
কিন্তু দেয়াল ভাংতে পারে না । এভাবে কিয়ামতের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত চলবে । কিন্তু হঠাৎ একদিন এ দেয়াল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে । তখনই ইয়াজুজ - মাজুজ দল স্রোতের ন্যায় মানব এলাকায় ঢুকে পড়বে ।
তারা সব কিছু খেয়ে ফেলবে । পানির পিপাসায় তারা দুনিয়ার সব সাগর , মহাসাগর , নদী বিল , ইত্যাদির পানি খেয়ে ফেলবে । সারা দুনিয়াকে তারা তছনছ করে ফেলবে । অবশ্যই তারা আল্লাহর হুকুমে সবাই মারা যাবে । ইয়াজুয ও মাজুযের দৌরাত্ম চরম পর্যায়ে পৌঁছলে হযরত ঈসা ( আঃ ) মুসলমানদেরকে নিয়ে দু'আ করবেন । ফলে ব্যাপক মহামারী দেখা দিবে । এতে এ অত্যাচারী সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যাবে ।
বিশেষ আলোচনা। সাওম - এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য।
‘ সাত্তম ' শব্দটি আরবী । সাওম বা সিয়াম শব্দের আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা । শরী'আতের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়্যাত সহকারে পানাহার এবং যৌনাচার থেকে বিরত থাকাকে ' সাওম ' বা রোযা বলা হয় । বস্তুত রোধা রাখার নিয়ম সর্বযুগেই প্রচলিত ছিল । হযরত আদম ( আ ) থেকে শুরু করে আখিরী নবী হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) পর্যন্ত নবী - রাসূলগণ সকলেই সিয়াম পালন করেছেন । আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইবন কাছীর ( র ) বলেন , ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোযা রাখার বিধান ছিল । পরে রমযানের রোযা ফরয হলে তা রহিত হয়ে যায় ।
হযরত ইবন আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , রাসূলুল্লাহ ( সা ) মদীনায় আগমন করে দেখলেন যে , ইয়াহুদীরা আশূরার দিন সাওম পালন করে । তিনি জিজ্ঞাসা করলেন , কী ব্যাপার ? তোমরা এ দিনে সাওম পালন কর কেন ? তারা বলল , এ অতি উত্তম দিন ।
এ দিনে আল্লাহ্ তা'আলা বানী ইসরাঈলকে শত্রুর কবল হতে নাজাত দান করেছেন । তাই হযরত মূসা ( আ ) এ দিনে সাওম পালন করেছেন । এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ( সা ) বললেন : আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসা ( আ ) -এর অধিক নিকটবর্তী ।
এরপর তিনি এ দিন সাওম পালন করেন এবং সকলকে সাওম পালনের নির্দেশ দেন । উপরোক্ত আলোচনায় প্রেক্ষিতে এ কথা প্রমাণিত হয় যে , হযরত মূসা ( আ ) , হযরত ঈসা ( আ ) এবং তাঁদের উম্মাতগণ সকলেই সাওম পালন করেছেন । যদিও ধরন ও প্রক্রিয়াগতভাবে তাদের সাওম আমাদের থেকে কিছুটা ভিন্নতর ছিল ।
নবীগণের মধ্যে হযরত দাউদ ( আ ) -এর রোযা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । আবদুল্লাহ্ ইবন আমর ইবনুল আস ( রা ) থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , নবী ( সা ) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন , তুমি কি সব সময় রোযা রাখ এবং রাতভর নামায আদায় করে থাক ? আমি বললাম , হ্যাঁ । তিনি বললেন , তুমি এরূপ করলে চোখ বসে যাবে এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে । যে সারা বছর রোযা রাখল সে যেন রোযাই রাখল না । যে ব্যক্তি মাসে তিন দিন করে রোযা রাখে সে যেন সারা বছরই রোযা রাখল । আমি বললাম , আমি এর চেয়ে বেশি করার সামর্থ্য রাখি ।
তিনি বললেন , তাহলে তুমি ' সাওমে দাউদী ' পালন কর । তিনি একদিন রোযা রাখতেন আর একদিন ছেড়ে দিতেন । ( ফলে তিনি দুর্বল হতেন না ) এবং যখন তিনি শত্রুর সম্মুখীন হতেন তখন পলায়ন করতেন না । মাওলানা সৈয়দ সুলায়মান নদভী ( র ) তাঁর সুবিখ্যাত সীরাত গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ডে ‘ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা'র বরাত দিয়ে লিখেছেন , প্রাচীন মিসরীয়দের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতেও রোযার প্রচলন পাওয়া যায় ।
কিয়ামতের পূর্ব মূহুর্তে যে ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটবে
গ্রীক ও পারসিক ধর্মেও সাওমের উল্লেখ পাওয়া যায় । সারকথা ইসলাম - পূর্ব ধর্মসমূহে রোযার প্রচলন ছিল । তবে কোন কোন ধর্মে রোযার ব্যাপারে বেশ স্বাধীনতা ছিল । এ অবাধ স্বাধীনতা রোষার ভাবমূর্তি ও প্রাণশক্তি সম্পূর্ণরূপে খতম করে দিয়েছিল ।
চারিত্রিক মহত্ত্ব , নৈতিক পরিচ্ছন্নতা , চিন্তার বিশুদ্ধতা , আত্মিক পবিত্রতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম এ রোযা কালক্রমে অন্তঃসারশূন্য নিছক এক অনুষ্ঠানে পর্যবসিত হয়ে পড়েছিল । এহেন অবস্থা হতে রোযাকে রহমত , বরকত ও মাগফিরাতের দিকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবং একে আত্মিক , নৈতিক কল্যাণের ধারক বানানোর নিমিত্তে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন রোযাকে উম্মাতের উপর ফরয করেন । ইরশাদ হয়েছে : يأيها الذين امنوا كتب عليكم الصيام كما كتب على الذين من قبلكم لعلكم تتقون . হে ঈমানদারগণ ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের
