মুসলমানদের মক্কা বিজয়। হযরত আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ। ইসলামের মহান বিজয়।

মুসলমানদের মক্কা বিজয়।হযরত আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ।ইসলামের মহান বিজয়।

মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের ইতিহাস। 


হুদাইবিয়ায় যে সন্ধিপত্র লেখা হয়েছিল , মুসলমানরা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও বিশ্বস্তার সহিত তা যথাযথ পালন করে আসছিল । ইত্যাবসরেই হিজরি ৮ ম সালে কুরাইশরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বসল । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্ধি পত্র নবায়নের জন্য কতিপয় শর্ত যুক্ত করে কুরাইশদের কাছে একজন দূত প্রেরণ করেন ।


 পরিশেষে একথা লিখে দিলেন , এ শর্তাবলী মনযুর করা না হলে হুদাইবিয়ার সন্ধি ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করা হবে । কুরাইশরা সন্ধি ভঙ্গ করাকেই পছন্দ করল । অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন । 

৮ ম হিজরির ১০ ই রমযান সোমবার আসরের পর দশ হাজার সাহাবায়ে কেরামের বিরাট এক বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে মদিনা ত্যাগ করেন । কুদাইদ পৌঁছার পর মাগরিবের সময় হয়ে গেলে সকলে সেখানেই ইফতার সেরে নেন । মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছার পর হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদকে সৈন্যের একটি অংশ দিয়ে মক্কার উঁচু দিক দিয়ে প্রবেশের জন্য প্রেরণ করে তাদের বলে দিলেন , কেউ তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ না করলে তোমরাও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে না । মক্কার অন্য দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করেন । 


এক সাধারণ ঘোষণায় তিনি বলে দিলেন , যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ , যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ , যে ব্যক্তি নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ । অবশ্য এমন ১১ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলাকে ক্ষমা করেন নি , যাদের অস্তিত্বই ছিল সকল ফেতনা - ফাসাদের উৎস , কিন্তু এরা সকলেও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এদের অধিকাংশই মক্কা বিজয়ের পর মদিনায় পৌঁছে মুসলমান হয়ে যায় ।


 ২০ শে রমযান জুমার দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ তওয়াফ করেন । তখনো বায়তুল্লাহর আশেপাশে ৩৬০ টি মূর্তি রাখা ছিল । হুযুরের হাতে ছিল একটি লাঠি । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো মূর্তির নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় সে লাঠি দ্বারা ইশারা করতেই মূর্তিটি মুখ থুবড়ে পড়ে যেত । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন নিম্নের আয়াতটি পড়ছিলেন । “ সত্য এসেছে , বাতিল ধ্বংস হয়েছে , নিশ্চয় বাতিল ধ্বংসশীল । "


কুরাইশদের সঙ্গে মুসলমানদের আচরণ।মুসলমানদের সভ্যতা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফ সেরে কাবার চাবি রক্ষক উসমান বিন তালহা শাইবার কাছ থেকে বাইতুল্লাহর চাবি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন।অতঃপর সেখান থেকে বের হয়ে মাকামে ইবরাহীমে নামায আদায় করলেন । 

নামায় শেষে তিনি মসজিদেই অবস্থান করছিলেন । আজ তিনি কুরাইশদের সম্পর্কে কী নির্দেশ জারি করেন লোকজন গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে তারই অপেক্ষা করছিল । কিন্তু সকল সন্দেহও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব শান্তির দূত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের সম্বোধন করে বললেন , তোমরা আজ সর্ব বিষয়ে নিরাপদ । অতঃপর কাবার চাবিও তাদের নিকট দিয়ে দিলেন।


আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ।কীভাবে হয়েছিল। 

আবু সুফিয়ান তখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে কুরাইশ পক্ষের প্রধান ছিলেন । সকল যুদ্ধেই তাদের সেনাপ্রধান তিনি হতেন । তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলিম সৈন্যের সংবাদ নেওয়ার জন্য মক্কা থেকে বের হয়েছিলেন । 

সাহাবারা তাকে গ্রেফতার করে ফেলেন । গ্রেফতার করে যখন তাকে রহমতে আলম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত করা হল , তখন সেখান থেকে তার ক্ষমার ঘোষণা হয়ে যায় । যার প্রতিক্রিয়া হল এই , তিনি তৎক্ষণাৎ ইসলাম কবুল করে মুসলমানদের দলভূক্ত হয়ে যান । তাই আমরা এখন তাকে " হযরত আবু সুফিয়ান রাযি . ” বলি । মক্কা বিজয়ের দিন এক ব্যক্তি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে হুজুরের দরবারে উপস্থিত হল । শান্তির বাহক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- “ শান্ত হও , আমি কোনো বাদশা নই । আমি একজন সাধারণ মায়ের সন্তান।


রাসুল সাঃ এর মক্কায় অবস্থান।কতোদিন মক্কায় ছিলেন।

 মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পনের দিন মক্কায় অবস্থান করেন । তখন মদিনার আনসারগণ এ চিন্তায় অস্থির ছিলেন , রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝি ওখানে থেকে যাবেন , আর আমরা হয়ে যাবো তার থেকে দূরে । 

কিন্তু তিনি তাদের মনের এ ধারণা জানতে পেরে বললেন , তোমাদের ধারণা সঠিক নয় ( বরং আমার জীবন - মরণ এখন তোমাদের সাথে ) । অতঃপর হযরত আত্তাব ইবনে উসাইদ রাযি . কে মক্কার আমির নিযুক্ত করে নিজে মদিনায় ফিরে আসেন ।



বিশেষ আলোচনা। নুবৃওয়াত ও রিসালাত : প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য।

 মানুষ সৎপথে চলার যোগ্যতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে । পরবর্তীতে প্রবৃত্তির তাড়নায় , শয়তানের প্ররোচনায় এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে সাধারণত অসৎপথে পরিচালিত হয় । ফলে হিংসা - বিদ্বেষ , পরশ্রীকাতরতা , নিষ্ঠুরতা , হত্যা , লুন্ঠন ইত্যাদির আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে । আবার কখনো নিজেকে অতিক্ষমতাধর মনে করে মানুষ সমাজে নানা ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করে । এতে মানব সমাজে নেমে আসে নানা বিপর্যয় । অত্যাচারী , সীমালংঘনকারীদের সীমাহীন তাণ্ডবলীলায় সমাজে নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয় । অত্যাচার , অনাচার ও পাপাচারে সমাজ হয়ে যায় চরমভাবে কলুষিত । ঘোর অন্ধকার তখন মানব সমাজকে আচ্ছন্ন করে নেয় । 

ভুলে যায় মানুষ তখন সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামীনকে । সমাজকে এ অবক্ষয় থেকে মুক্ত করার জন্য নবী - রাসূলগণের আগমন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায় । তাই মহান আল্লাহ্ মানবজাতিকে সঠিক ও  সরল পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে পাঠিয়েছেন নবী ও রাসূলগণের এক সুমহান জামা'আত । নবী - রাসূলগণের আবির্ভাব না হলে সত্য ও আলোর সন্ধান মানুষ কোনক্রমেই লাভ করতে সক্ষম হত না । আল্লাহ্র সত্তা হল অসীম ।


 কিন্তু মানুষের জ্ঞান - বুদ্ধি হল সীমাবদ্ধ । এই সীমাবদ্ধ জ্ঞান - বুদ্ধির দ্বারা আল্লাহ্র সত্তা ও গুণাবলীর পরিচয় লাভ করা আদৌ সম্ভব নয় । তাই আল্লাহ্ তা'আলা একান্ত দয়াপরবশ হয়ে মানুষের হিদায়াত ও কল্যাণের জন্য এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন হযরত আদম ( আ ) থেকে আরম্ভ করে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) পর্যন্ত আম্বিয়ায়ে কিরামের এক সুমহান সিল্‌সিলা । আর তাঁদেরকে দিয়েছেন দিক - নির্দেশনারূপে বহু কিতাব ও সহীফা । নবী 

- রাসূল এবং তাঁদের প্রতি নাযিলকৃত কিতাবের মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহকে চিনতে পারে , তাঁর হুকুম - আহকাম এবং তাঁর পসন্দনীয় পথ ও মত ইত্যাদি জানতে পারে । মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের সাহায্যে ঊর্ধ্বলোক ও অদৃশ্য জগত সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে সক্ষম হয় না । 


হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী শায়খ আহমাদ সরহিন্দী ( র ) স্বীয় মাকতুবাতে এ প্রসঙ্গে বলেন , “ মানুষের বিবেক - বুদ্ধি নবীগণের সহযোগিতা ও পথপ্রদর্শন ছাড়াও বিশ্বস্রষ্টার অস্তিত্ব নির্ণয় করতে পারে বটে , কিন্তু আল্লাহ্র অস্তিত্বের সাথে তাঁর মৌলিক গুণাবলীর সঠিক পরিচিতি , তাঁর পবিত্রতা , নিষ্কলুষতা , ইত্যাদি বিষয়ে অবগত হওয়া নবী - রাসূলগণের সহযোগিতা ব্যতিরেকে আদৌ সম্ভব নয় । ১৪ নুবৃওয়াত ও রিসালাতের আবশ্যকতার কথা উল্লেখ করে প্রখ্যাত গবেষক আলিমগণ বলেন , এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে , এক বিশেষ পরীক্ষার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ্ তা'আলা মানবজাতিকে এ পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রতি বিভিন্ন দায়িত্ব ও বিধি - বিধান আরোপ করেছেন । 


বস্তুত মানুষ হচ্ছে আল্লাহ্ বান্দা । আর আসমান - যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে যত কিছু আছে সবই হচ্ছে মানুষের স্বেচ্ছাসেবী খাদিম । কি করে মানুষ আল্লাহর দাসত্ব করবে এবং দুনিয়ার এসব বস্তু কেমন করে তারা ব্যবহার করবে তা জানার জন্য শুধুমাত্র মানুষের জ্ঞান - বুদ্ধি যথেষ্ট নয় বলেই আল্লাহ্ তা'আলা নবী - রাসূলগণকে মনোনীত করেছেন এবং তাঁদের প্রতি নাযিল করেছেন ওহী । বস্তুত ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান এবং বুদ্ধি - 



বিবেচনালব্ধ জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধতা আছে বলে এতে নানা ধরনের ভুল ভ্রান্তির সম্ভাবনার রয়েছে । কিন্তু নবী - রাসূলগণের মাধ্যমে প্রাপ্ত ওহীভিত্তিক জ্ঞানে ভুল - ভ্রান্তির আদৌ কোন সম্ভাবনা নাই । কাজেই ওহীলব্ধ জ্ঞানই একমাত্র নির্ভুল এবং নির্ভরযোগ্য জ্ঞান । ইস্‌মতে আম্বিয়া — নবীগণের নিষ্পাপ হওয়া ইসমতে আম্বিয়ার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মাওলানা ইদ্রীস কান্দলভী ( র ) বলেন , “ যাহির - বাতিন তথা ভিতর ও বাহির শয়তান কুপ্রবৃত্তির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা এবং এগুলোর প্ররোচনা থেকে।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post