কাদের উপর হজ্জ ফরয। হজ্জের সফরের আদবসমূহ। বিশেষ আলোচনা।

কাদের উপর হজ্জ ফরয।হজ্জের সফরের আদবসমূহ।বিশেষ আলোচনা। 


হজ্জ সংক্রান্ত আলোচনা। 


* যার নিকট মক্কা শরীফ থেকে হজ্জ করে ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবারের আবশ্যকীয় খরচ বাদে মক্কা শরীফ যাতায়াতের মোটামুটি খরচ পরিমাণ অর্থ  থাকে তার উপর হজ্জ ফরয । ব্যবসায়িক পণ্য এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমির মূল্য এ অর্থের হিসেবে গণ্য করতে হবে । 

* মেয়েলোকের জন্য নিজ স্বামী বা নিজের কোন বিশ্বস্ত দ্বীনদার মাহরাম পুরুষ ব্যতীত হজ্জে যাওয়া দুরস্ত নয় । শুধু এমন কোন কোন মহিলা থাকা যথেষ্ট নয় , যার সাথে তার মাহরাম পুরুষ রয়েছে । 

* অন্ধের উপর হজ্জ ফরয নয় যত ধনই থাকুক না কেন ? 

* নাবালেগের উপর হজ্জ ফরয হয় না । নাবালেগ অবস্থায় হজ্জ করলেও বালেগ হওয়ার পর সম্বল হলে পুনরায় হজ্জ করতে হবে । হজ্জ ফরয হওয়ার পর না করা বা বিলম্ব করা : 

* হজ্জ ফরয হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে সেই বৎসরই হজ্জ করা ওয়াজিব বিনা ওজরে দেরী করা পাপ । ছেলে মেয়ের বিবাহ শাদী দেয়ার জন্যে বা বাড়ি তৈরী করার জন্যে বিলম্ব করা কোন গ্রহণযোগ্য ওজর নয় । শেষ বয়সে হজ্জ করব- এরূপ ধারণাও ভুল । বরং বয়স থাকতে হজ্জ করতে গেলেই হজ্জের ক্রিয়াদি ভালভাবে আদায় করা সহজ হয় । 

* হজ্জ ফরয হওয়ার পর আলস্য করে বিলম্ব করলে এবং পরে গরীব বা শক্তিহীন হয়ে গেলেও ঐ ফরয তার যিম্মায় থেকে যাবে - মাফ হবে না , যে কোন উপায়ে তাকে হজ্জ করতে হবে বা মৃত্যুর পূর্বে বদলী হজ্জের ওছিয়াত করে যেতে হবে । 

* মাতা - পিতার হজ্জের পূর্বে সন্তান হজ্জ করতে পারে না- এই ধারণা ভুল । অতএব এ ধারণার বশবর্তী হয়ে হজ্জে বিলম্ব করা গ্রহণযোগ্য ওজর নয় । 

* হজ্জ ফরয হওয়া সত্ত্বেও যে হজ্জ না করে মৃত্যুবরণ করে , তার জন্য ভীষণ আযাবের সংবাদ দেয়া হয়েছে । এরূপ লোক সম্পর্কে হাদীছে বলা হয়েছেঃ সে ইয়াহুদী হয়ে মরুক বা নাছারা হয়ে মরুক । 


হজ্জের সফরের আদবসমূহঃ যা করনীয় ও যা বর্জনীয়। 

১. নিয়ত খালেছ করে নিবেন অর্থাৎ , একমাত্র আল্লাহ্‌কে রাজি খুশি করার নিয়ত রাখবেন । নাম শোরত , দেশ ভ্রমন , আবহাওয়া পরিবর্তন , হাজী উপাধি অর্জন ইত্যাদি নিয়ত রাখবেন না । 

২. খাঁটি অন্তরে তওবা করতে হবে । অর্থাৎ , কৃত গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে , এখনই গোনাহ বর্জন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে গোনাহ না করার পাকাপোক্ত নিয়ত করতে হবে । কারও টাকা - পয়সা বা সম্পদের হক নষ্ট  করে থাকলে তার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিতে হবে । পাওনাদার জীবিত না থাকলে তাদের উত্তরাধীকারীদের থেকে তার নিষ্পত্তি করে নিতে হবে । সেরূপ কারও সন্ধান না পেলে পাওনাদারের সওয়াবের নিয়তে পাওনা পরিমাণ অর্থ তার পক্ষ থেকে দান করে দিতে হবে । কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে তার থেকে মাফ করিয়ে নিতে হবে । 

৩. মাতা - পিতা জীবিত থাকলে এবং তাদের খেদমতে থাকার প্রয়োজন থাকলে তাদের এজাযত ব্যতীত নফল হজ্জে গমন করা মাকরূহ । খেদমতের প্রয়োজন থাকলে ফরয হজ্জে এজাযত ব্যতীত যাওয়া মাকরূহ নয় , যদি পথ ঘাট নিরাপদ থাকে । মাতা পিতারও উচিত এজাযত দিয়ে দেয়া । 

৪. সফর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত সময়ের জন্য পরিবার পরিজন ও অধীনস্থদের প্রয়োজনীয় খরচাদির ব্যবস্থা করে যেতে হবে । 

৫. কোন ঋণ নগদ আদায় করার থাকলে পাওনাদারের অনুমতি গ্রহণ করবেন । তার অনুমতি ব্যতীত হজ্জে গমন করা মাকরূহ । তবে যদি কাউকে ঋণ আদায়ের দায়িত্ব অর্পন করে যাওয়া যায় , এবং পাওনাদারগণ তাতে সম্মত থাকে , তাহলে অনুমতি ব্যতীতও যাওয়া মাকরূহ হবেনা । আর ঋণ যদি নগদ আদায় করার না হয় , বরং মেয়াদ বাকী থাকে এবং মেয়াদের পূর্বেই হজ্জ থেকে ফিরে আসার হয় , তাহলে সেই পাওনাদারের অনুমতি গ্রহণ ব্যতীতও হজ্জে গমনে কোন অসুবিধা নেই । তবে পাওনা দাওনা সম্পর্কিত একটি তালিকা তৈরী করে রেখে যাবেন । 

৬. নিজের কাছে কারও থেকে ধার করা জিনিস বা কারও আমানত থাকলে তা মালিককে বুঝিয়ে দিয়ে যাওয়া চাই । 

৭. সফরে গমনের পূর্বে কোন বিচক্ষণ অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাথে সফরের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি সম্পর্কে পরামর্শ করে নিন । 

৮. উত্তম সফরসঙ্গী নির্বাচন করুন । পূর্ব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আলেম হলে উত্তম হয় , যার কাছে প্রয়োজনে হজ্জের মাসায়েল ইত্যাদি জেনে নেয়া যাবে । 

আলেম না পেলে অন্ততঃ একজন অভিজ্ঞ দ্বীনদার হাজীকে সফরসঙ্গী বানানোর চেষ্টা করবেন । ৯. হজ্জের মাসায়েল শিক্ষা করে নিবেন । 


হজ্জের মাসায়েল শিক্ষা করাও ফরয । দুআ কালামের ফযীলত আছে , তবে দুআ কালামের উপর জোর দিতে যেয়ে জরুরী মাসায়েল থেকে অমনোযোগী ও উদাসীন হওয়া চাইনা । হজ্জ ও উমরা সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য মাসায়েলের কিতাবও সাথে রাখা চাই যাতে প্রয়োজনের মুহূর্তে কিতাব দেখে নেয়া যায় । অনেকে তওয়াফ , সায়ী ইত্যাদির দুআ মুখস্ত করতে পারেননা বলে হতাশ হন । হতাশ হওয়ার কিছু নেই , একান্ত মুখস্ত করতে না পারলে এসব দুআ ব্যতীতও হজ্জ হয়ে যাবে । তবে এসব দুআ সুন্নাত বা মুস্তাহাব , তাই সম্ভব হলে হিম্মত করে আমল করার চেষ্টা করুন । 

১০. হজ্জ উমরার সফর একটি বরকতময় সফর । এ সফরে সফরের যাবতীয় সুন্নাত আদব ইত্যাদি আমল করা চাই ।



বিশেষ আলোচনা।কাযায়ে হাজাতের নামায। 

' সালাতুল হাজাত ' বা প্রয়োজন পূরণের দুই রাকা'আত নামায পড়া মুস্তাহাব । কেউ কোন ধরনের বিপদ - আপদ বা অভাব - অনটনে পড়লে অথবা কারো মনে আশা - আকাঙ্ক্ষা থাকলে তা পূরণের জন্য সর্বাগ্রে আল্লাহ তা'আলার রহমতের কথা স্মরণ করতে হয় । 

উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথাসাধ্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দুই রাকা'আত নামায আদায় করতে হয় । একবার একজন দৃষ্টিহীন সাহাবী নবী কারীম ( সা ) -এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করলো , হে আল্লাহর রাসূল ! 

আমার দৃষ্টিশক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করুন । নবী কারীম ( সা ) ইরশাদ করেন , তুমি ধৈর্যধারণ করলে অনেক প্রতিদান পাবে আর তুমি বললে দু'আ করতে পারি । লোকটি দু'আ করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করায় নবী কারীম ( সা ) তাকে এ নামায শিক্ষা দেন ।১০২ এ নামাযের নিয়্যাত করতে হবে এভাবে : نويت أن أصلى الله تعالى ركعتى صلواة الحاجة سنة رسول الله تعالى متوجها إلى جهة الكعبة الشريفة الله اكبر  আল্লাহ্ ওয়াস্তে কিবলামুখী হয়ে রাসূলের সুন্নাত দুই রাকা'আত সালাতুল হাজতের নামায আদায় করছি , আল্লাহু আক্ৰার । নামায শেষ করে নিজেরকৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে হয় , তারপর আল্লাহ্ত্র প্রশংসা করতে হয় এবং দুরূদ শরীফ পড়ে নিম্নের দু'আটি কয়েকবার পড়তে হয় : لا إله الا الله الحليم الكريم سبحان الله رب العرش العظيم الحمد لله رب العلمين اسئلك موجبات رحمتك وعزائم مغفرتك والغنيمة من كل بر والسلامة من كل إثم لا تدع لنا ذنبا إلا غفرته ولا هما الا فرجته ولا حاجة هي لك رضا الأقضيتها يا أرحم الرحمين . আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই , তিনি ত্রুটি - বিচ্যুতি উপেক্ষাকারী এবং বড়ই দয়াবান । 


তিনি ত্রুটি - বিচ্যুতি থেকে পবিত্র , বিশাল আরশের তিনি মালিক , প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর , তিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক । ( ওগো প্রভু ) আমি আপনার কাছে সে - সব জিনিস ভিক্ষা চাচ্ছি , যার জন্য আপনার রহমত অপরিহার্য এবং যা আপনার দান ও মাগফিরাতের কারণ হয় । 

আমি প্রতিটি মঙ্গলের অংশীদার হওয়ার কামনা করি । আর প্রতিটি পাপ থেকে নিরাপদ থাকার ইচ্ছা পোষণ করি । ( ওগো প্রভু ) আপনি আমার গুনাহ্ ক্ষমা করা ছাড়া এবং আমার দুঃখ - দুর্দশা দূর করা ব্যতীত ক্ষান্ত হবেন না এবং আমার যেসব প্রয়োজন আপনার পসন্দনীয় তা পূরণ না করে ছাড়বেন না , আপনি অনুগ্রহকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহকারী । 300 এরপর মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য যা চাওয়ার তা চাইতে হয় ।



 এ নামায প্রয়োজন পূরণের জন্য পরীক্ষিত । তাহিয়্যাতুল মসজিদ মসজিদে প্রবেশকারীদের জন্য দুই রাকা'আত বা আরো অধিক নামায পড়া সুন্নাত । এ নামাযকেই বলা ' তাহিয়্যাতুল মসজিদ ' - এর নামায ।


 নবী কারীম ( সা ) ইরশাদ করেন : তোমাদের মধ্য থেকে কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে , দুই রাকা'আত নামায পড়ার আগে বসবে না । ১০ মসজিদ হচ্ছে আল্লাহ্র ঘর । আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত - বন্দেগীর জন্য মসজিদ তৈরি করা হয় । তাই , মসজিদে প্রবেশের পরই আল্লাহর দরবারে সিজ্দাবনত হওয়া উচিত । কেউ মসজিদে প্রবেশ করার পর ফরয , ওয়াজিব বা সুন্নাত নামায আদায় করলেও তাহিয়্যাতুল মসজিদের নামায আদায় হবে । নিয়্যাত করবেন এভাবে : نويت أن أصلى لله تعالى ركعتي صلواة تحية المسجد سنة رسول الله تعالى متوجها
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post