আলামতে কিয়ামত।কিয়ামত কখন সংগঠিত হবে।কিয়ামতের অন্তিম মূহুর্তে যা ঘটবে।
![]() |
| কিয়ামতের আলামত। |
হযরত হুযায়ফা ইব্ন আসিফ গিফারী ( রাঃ ) বর্ণিত , তিনি বলেন , একদা আমরা কিয়ামত সন্বন্ধে আলোচনা করছিলাম । এমন সময় নবী করীম ( সাঃ ) আমাদের সম্মুখে তাশরীফ আনলেন । তিনি আমাদেরকে বললেন , তোমরা কি বিষয়ে কথাবার্তা বলছ ?
আমরা বললাম , কিয়ামত সম্পর্কে । তিনি বললেন , কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হবে না , যতক্ষণ না তোমরা দশটি পূর্ব লক্ষন দেখতে পাবে । এরপর তিনি লক্ষণগুলো উল্লেখ করেন যে , এগুলো হল ধোকা দাজ্জাল , দাব্বাতুল আরদ , পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয় , হযরত ঈসা ( আঃ ) এর অবতরণ , ইয়াজ্য - মাজ্য এর বহিঃপ্রকাশ , তিনটি ভুমিধসঃ একটি প্রাচ্যে , একটি পাশ্চাত্যে এবং একটি আরব দেশে ।
অবশেষে ইয়ামান থেকে উত্থিত একটি অগ্নি মানুষদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে । ( সহীহ্ মুসলিমঃকিতাবুল ফিতান ) অপর একটি হাদীসে বর্ণিত রয়েছে , পৃথিবীতে যখন ' আল্লাহ ' বলার মত কোন লোক থাকবে না অর্থাৎ ঈমানের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটবে তখনই কিয়ামত সংঘটিত হবে ( মুসলিম ) ।
একটি হাদীসে কেয়ামতের প্রতিচ্ছবি।কিয়ামত কিভাবে রূপ ধারণ করবে।
হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত কিতাব মুসলিম শরীফে উল্লেখ আছে - নাওয়াস ইবনে সামআন ( রাঃ ) থেকে বর্ণিত । নবী করীম ( সাঃ ) ' দাজ্জাল ' সম্পর্কে আলোচনা করলেন । তিনি কখনও এ বিষয়টিকে অবজ্ঞার সুরে প্রকাশ করলেন , আবার কখনও গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করলেন । এমনকি আমাদের ধারণা হ'ল দাজ্জাল খেজুর বাগানের কোন একস্থানে লুকিয়ে আছে ।
যখন আমরা তাঁর কাছ থেকে ফিরে যাচ্ছিলাম । তিনি আমাদের প্রকৃত অবস্থা বুঝে ফেললেন । তিনি জিজ্ঞেস করলেন , তোমাদের কি হয়েছে ? আমরা বললাম , হে আল্লাহর রাসূর ( সাঃ ) ! আপনি সকাল বেলা দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন ।
আপনি তা অবজ্ঞাভাবে এবং কখনও গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছিলেন । এতে আমাদের ধারনা হয়েছিল , সম্ভবতঃ ঐ সময়ে খেজুর বাগানের কোথাও অবস্থা করছে । তিনি বললেন- তোমাদের ব্যাপারে আমি দাজ্জালের ফেতনার খুব একটা আশংকা করি না ।
যদি আমার উপস্থিতিতে সে আত্মপ্রকাশ করে তবে আমি নিজে তোমাদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়াব । আর যদি আমার অবর্তমানে সে আত্মপ্রকাশ করে তবে প্রত্যেকে নিজেরাই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে । আল্লাহ আমার অবর্তমানে তোমাদের রক্ষক ।
দাজ্জাল ছোট কোঁকড়ানো চুল বিশিষ্ট যুবক । তার চোখ হবে ফোলা । আমি তাকে আব্দুল ' উয্যা ইবনে কাতান ' সদৃশ্য মনে করি । যে ব্যক্তি তার সাক্ষাত পাবে সে যেন ' সূরা কাহাফের প্রথম আয়তগুলো পাঠ করে । দাজ্জাল সিরিয়া ও ইরাকের সাথে সংযোগ রক্ষাকারী রাস্তায় আত্মপ্রকাশ করবে । সে তার ডানে ও বাঁয়ে হত্যা , ধ্বংস ও ফিতনা - ফাসাদ ছড়াবে ।
হে আল্লাহর বান্দাগণ অটল ও স্থির হয়ে থাক । আমরা জিজ্ঞেস করলাম , হে আল্লাহর রাসূল ( সাঃ ) ! সে কত সময় পৃথিবীতে বর্তমান থাকবে ? তিনি বললেন , চল্লিশ দিন । এর প্রথম দিন হবে , এক বছরের সমান , দ্বিতীয় দিন হবে এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিন হবে এক সপ্তাহের সমান । অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের এই দিনের মতই দীর্ঘ হবে ।
আমরা জিজ্ঞেস করলাম হে আল্লাহর রাসূল ( সাঃ ) ! যে দিনটি এক বছরের সমান হবে সেদিনে কি এক দিনের নামাযই আমাদের যথেষ্ট হবে ? তিনি বললেনঃ না বরং অনুমান করে নামাযের সময় ঠিক করে নিতে হবে । আমরা জিজ্ঞেস করলাম হে আল্লাহর রাসূল ( সাঃ ) ! পৃথিবীতে দাজ্জাল কত দ্রুত গতি সম্পন্ন হবে তিনি জবাব দিলেন বাতাস তাড়িত মেঘের মত দ্রুতগতি সম্পন্ন হবে । সে এক সম্প্রদায়ের কাছে আসবে এবং তাদরেকে নিজের দিকে আহবান করেবে । তারা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তার হুকুমের অনুসরণ করবে । সে আসমানকে নির্দেশ দিবে ।
আসমান তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে । সে যমীনকে হুকুম দিবে এবং যমীন উদ্ভিদ উৎপাদন করবে । তাদের গৃহপালিত জন্তুগুলো বাড়ি ফিরবে । এ গুলোর পূঁজ সুউচ্চ , দুধের বাঁটগলো লম্বা এবং স্ফীত হবে । অতঃপর সে আর এক সম্প্রদায়ের কাছে আসবে এবং তাদেরকে নিজের দিকে আহবান করবে । তারা তার আহবান প্রত্যাখান করবে । দাজ্জাল তাদের কাছ থেকে চলে যাবে । তারা অতিদ্রুত অজন্মা ও দূর্ভিক্ষের কবলে পতিত হবে । তাদের হাতে ধন - সম্পদ কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না । দাজ্জাল এই বিধ্বস্ত এলাকা দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলবে , তোমাদের গচ্ছিত সম্পদরাজি বের করে দাও । সাথ সাথে সে এলাকার ধন - সম্পদ মধু মক্ষিকার ন্যায় তার অনুসরণ করবে । অতঃপর সে পূর্ণ বয়স্ক এক যুবককে আহবান করবে ।
কিন্তু সে তাকে অস্বীকার করবে দাজ্জাল তাকে তরবারী দিয়ে দ্বিখন্ডিত করে ফেলবে । অতঃপর সে ডাকবে এবং টুকরা দুটো চলে আসবে । তার চেহারা তখন প্রফুল্ল ও হাস্যময় হবে । ইত্যবসরে আল্লাহ তা'য়ালা মাসীহ ইবনে মরিয়ম ( আঃ ) -কে পাঠাবেন । তিনি দামেস্কের পূর্ব অংশে সাদা মিনারের উপরে হালকা জাফরানী ( হলুদ ) রং - এর কাপড় পরিহিত অবস্থায় ফেরেশতাদের কাঁধে ভর দিয়ে নেমে আসবেন । যখন তিনি মাথা নত করবেন , তখান মনে হবে যেন তাঁর মাথায় মুক্তার মত পানির বিন্দু টপকাচ্ছে । যখন তিনি মাথা উঠাবেন , তখনও তাঁর মাথা থেকে মতির দানার মত ঝরছে বলে মনে হবে । যে কাফেরের গায়ে তাঁ নিঃশ্বাসও লাগবে তা বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না । ( সাথে সাথে মরে যাবে ) । তার দৃষ্টি যত দূর যাবে , তাঁর নিঃশ্বাসও ততদূর পৌঁছাবে । তিনি দাজ্জালকে পিছু ধাওয়া করবেন এবং লুদ নামক স্থানে তাকে হত্যা করবেন । অতঃপর ঈসা ( আঃ ) ঐ সব লোকদের কাছে আসবেন যাদেরকে আল্লাহ দজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ রেখেছেন ।
তিনি তাদের চেহারা থেকে মলিনতা দূর করে দেবেন , এবং বেহেশতে তাদের যে মর্যাদা হবে , তা বর্ণনা করবেন । ইত্যবসরে আল্লাহ ঈসা ( আঃ ) -এর কাছে এই মর্মে নির্দেশ পাঠাবেন যে , আমি এমন একদল বান্দা পাঠিয়েছি , যাদের বিরূদ্ধে অস্ত্র ধরার শক্তি কারো হবে না ।
তুমি আমার এসব বান্দাকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও । এরপর আল্লাহ ইয়াজুজ মাজুজের সম্প্রদায়কে পাঠাবেন । তারা প্রত্যেক উচ্চ ভূমি থেকে দ্রুত বেগে বেরিয়ে আসবে । তাদের অগ্রবর্তী দলগুলো তাবারিয়া হ্রদের উপর দিয়ে অতিক্রম করবে । তারা এ হ্রদের সব পানি পান করে ফেলবে । তাদের পরবর্তী দলও এ এলাকা দিয়ে অতিক্রম করবে ।
তারা বলবে , এখানে কোন এক সময় পানি ছিল । আল্লাহর নবী ঈসা ( আঃ ) ও তার সংগীরা আল্লাহর কাছে কাতরভাবে প্রার্থনা করবেন । আল্লাহ তা'য়ালা তাদের ( ইয়াজুজ - মাজুজ ) প্রত্যেকের ঘাড়ে এক ধরণের কীট সৃষ্টি করে দিবেন । ফলে তারা সবাই একসাথে ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর আল্লাহর নবী ঈসা ( আঃ ) ও তার সংগীগণ পাহাড় থেকে জনপদে নেমে আসবেন । কিন্তু তারা পৃথিবীতে এক ইঞ্চী জায়গাও ইয়াজুজ - মাজুজের লাশ ও এর দূর্গন্ধ ছাড়া খালি পাবে না । অতঃপর আল্লাহর নবী ঈসা ( আঃ ) ও তাঁর সাহাবা আল্লাহর কাছে কাতর ভরে প্রশ্ন করবেন ।
আল্লাহ তা'য়ালা আল - বুকতী উটের সদৃশ পাখী পাঠাবেন । এসব পাখী যেগুলোকে উঠিয়ে আল্লাহ যেখানে ফেলে দেয়ার নির্দেশ দেবেন , সেখানে ফেলে দেবে । অতঃপর ভূমিকে বলা হবে , তোমরা ফল উৎপাদন কর এবং বরকত ফিরিয়ে নাও ।
এত বরকত , কল্যাণ ও প্রাচুর্য দেখা দেবে একটি ডালিম খেয়ে পূর্ণ একটি দল পরিতৃপ্তি হবে এবং ডালিমের খোসাটি এত বড় হবে যে , তার ছায়ায় তারা আশ্রয় নিতে পারবে । গবাদি পশুতেও এত বরকত দেয়া হবে যে একটি মাত্র দুধের উটের দুধ হবে একটি বড় দলের জন্য যথেষ্ট । একটি দুধের গাভীর দুধ একটি গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে । এই সময়ে আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র হাওয়া প্রবাহিত করবেন । এই বাতাস তাদের বগলের নিচে পর্যন্ত লাগবে ফলে সকল মুমিন ও মুসলমানের রূহ্ কবজ হয়ে যাবে , শুধু খারাপ লোকেরাই বেঁচে থাকবে । তারা গাধার মত প্রকাশ্যে সহবাস করবে । তাদের বর্তমানেই কেয়ামত সংঘটিত হবে ।
বিশেষ আলোচনা। মুমূর্ষু ব্যক্তির করণীয়।
কোন মু'মিন যদি বুঝতে পারে তার মৃত্যু আসন্ন । এহেন মুমূর্ষু লোকের জীবনের অন্তিমকালে অবনত মস্তকে ভক্তিসহকারে দু'রাকা'আত নামায পড়ে মহান আল্লাহর দরবারে অতীত জীবনের সমুদয় গুনাহর জন্য প্রার্থনা করা উচিত । তবেই , এই নামায এবং তাওবা তার ইহজীবনের সর্বশেষ নেক আমল হিসেবে পরিগণিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে ।
নবী কারীম ( সা ) -এর সময় থেকেই এ নামায মুস্তাহাবরূপে পড়ার প্রচলনের বর্ণনা পাওয়া যায় । মৃত ব্যক্তির জন্য করণীয় মানুষ মরণশীল । নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে মানুষকে একদিন পাড়ি জমাতে হয় অবিনশ্বর জগতের উদ্দেশ্যে । সাড়ে তিন হাত মানুষের শরীর থেকে রূহ বা আত্মা বেরিয়ে গেলেই মানুষ মৃত বলে পরিগণিত হয় । মৃত ব্যক্তির জন্য জীবন্ত মানুষের অবশ্যই কিছু করণীয় রয়েছে ।
এখানে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো : ক . মৃতের গোসল ১. নবী কারীম ( সা ) ইরশাদ করেছেন , কাফন দাফনে তাড়াতাড়ি কর । মৃত ব্যক্তি কারো বাড়িতে বেশি সময় পড়ে থাকা ঠিক নয় । ১০৯ ২. মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়া ফরযে কিফায়া । কেউ লা - ওয়ারিস হলে তার গোসলের দায়িত্ব সামষ্টিকভাবে সকল মুসলমানের ।
গোসল ব্যতীত কোন মৃতকে দাফন করা হলে জ্ঞাত সব মুসলমানই গুনাহ্গার হবে । ৩. গোসল ছাড়া কোন মৃতকে কবরে রাখা হলে , তার উপর মাটি দেয়া না হলে , তাকে উঠিয়ে গোসল দেয়া অত্যাবশ্যক । অবশ্য , উপরে মাটিদ্বারা ভরাট করে ফেললে পুনরায় কবর থেকে উঠানো ঠিক নয় । ৪. কাফন পরানোর পর মনে পড়লো মৃতের কোন অঙ্গ বা অংশ ধোয়া হয়নি , এমতাবস্থায় কাফন খুলে ধুয়ে নিতে হবে । সামান্য অংশ শুকনো থাকলে , যেমন কোন আঙ্গুল শুকনো রয়ে গেছে বা সে পরিমাণ অন্য কোন অংশ , এমতাবস্থায় কাফন খুলে ধুয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই । ৫. মৃতকে একবার গোসল দেয়া ফরয । তিনবার দেয়া সুন্নাত । ৬. পুরুষ নারীর এবং নারী পুরুষের গোসল দিতে পারে না ।
স্ত্রী স্বামীর গোসল দিতে পারবে । কারণ , ইদ্দতের সময় পর্যন্ত তাকে স্বামীর বিয়ের মধ্যেই ধরতে হবে । কিন্তু স্বামী তার স্ত্রীর গোসল দিতে পারবে না । কারণ স্ত্রীর ইতিকালের সাথে সাথেই বিয়ে শেষ হয়ে যায় । ৭. অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক - বালিকাকে নারী - পুরুষ উভয়েই গোসল দিতে পারবে ।
৮. মৃতের প্রিয়জনদেরই গোসল দেয়া ভালো । পদ্ধতি জানা না থাকলে অবশ্য অন্য যে কেউ গোসল দিতে পারে । ৯. নবজাত শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই ইতিকাল করলে তাকে গোসল দেয়া ফরয । মৃতাবস্থায় ভূমিষ্ঠ হলেও গোসল দেয়া ভালো । মৃতের গোসলের মাসনূন তরীকা গোসলের সময় মৃতকে চৌকি বা গোসলের খাটিয়ার উপর শোয়াতে হয় ।
তারপর পরনের কাপড় সরিয়ে পুরুষ হলে নাতি থেকে হাঁটু পর্যন্ত একটা কাপড় রাখতে হয় । এরপর হাতে কাপড় জড়িয়ে পেশাব - পায়খানার জায়গা পরিষ্কার করে দিতে হয় । এরপর উযূ করাতে হয় ।
প্রথমে সমুদয় মুখমণ্ডল , পরে কনুই পর্যন্ত দু'হাত , তারপর মাথা মাসেহ্ , অবশেষে দু'পা । নাকে ও মুখে পানি দেয়ার দরকার নেই । তুলা ভিজিয়ে দাঁতের মাড়ি এবং নাকের ভেতর মুছে দেয়া জায়িয । গোসল ফরয অবস্থায় এবংং হায়িয - নিফাস অবস্থায় মারা গেলে মুখে ও নাকে পানি পৌঁছানো জরুরী । পানি যেন ভেতরে না যায় সেজন্য নাক , মুখ ও কানে তুলা দিতে হয় ।
