আবিসিনিয়া অভিমুখে মাযলুম মুসলমানদের প্রথম হিজরত। হযরত জাফর ইবনে আবী তালিবের ঐতিহাসিক বক্তব্য। ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়।

আবিসিনিয়া অভিমুখে মাযলুম মুসলমানদের প্রথম হিজরত।হযরত জাফর ইবনে আবী তালিবের ঐতিহাসিক বক্তব্য।ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়।


মুসলমানদের প্রথম হিজরত। 


রাসূলুল্লাহ ( সা ) যখন দেখতে পেলেন যে , তাঁর সাহাবাগণ তথা সঙ্গী সাথীদেরকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে এবং তিনি তাঁদের হেফাজত ও প্রতিরোধ করতে পারছেন না তখন তিনি তাঁদেরকে বললেন : যদি তোমরা চাও তবে আবিসিনিয়ার দিকে বেরিয়ে গেলে ভাল হবে । সেখানকার যিনি বাদশাহ তাঁর জন্য কেউ কারুর ওপর জুলুম করে না । 

দেশটা খুব ভাল । যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তোমাদের জন্য মুক্তির ও প্রশস্ততার অন্য কোন ব্যবস্থা করছেন এটাই তোমাদের জন্য ভাল হবে । এই সময় মুসলমানদের একটি দল আবিসিনিয়ার দিকে হিজরত করল । ইসলামে এটাই ছিল প্রথম হিজরত ।

 এই দলে ছিল দশজন মুসলিম । দলের আমীর নিযুক্ত হয়েছিলেন হযরত উছমান ইবন মাজ'ঊন ( রা ) । এরপর জা'ফর ইবন আবী তালিব ( রা ) হিজরত করেন । এরপর একে একে অনেক মুসলমানই সেখানে গিয়ে পৌছেন । এঁদের ভেতর কেউ ছিলেন একাকী এবং কেউ কেউ পরিবার - পরিজনসহ হিজরত করেছিলেন । 


এসব লোক যাঁরা আবিসিনিয়া পানে হিজরত করেছিলেন তাঁদের মোট সংখ্যা ৮৩ জন ছিল বলে কথিত । ২ ১. সীরাত ইবন হিশাম , ১ খ . ২৯৩-৯৪ পৃ ২. সীরাত ইবন হিশাম , ১ খ . ৩২০-২১পৃ .। আবিসিনিয়া অভিমুখে হিজরতের পেছনে কুরায়শদের অত্যাচার - নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য ছিল না , বরং বিদেশ - বিভুঁইয়ে ইসলামের দাওয়াত পৌছে দেওয়া , সেই সঙ্গে নবী করীম ( সা ) -এর দুশ্চিন্তার লাঘবও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল । 


মুহাজিরদের তালিকা পর্যালোচনা করলে এর পরিধির বিশালতা ও বৈচিত্র্যের পরিমাপ করা যায় এবং জানা যায় যে , এই তালিকায় সমাজের সর্বশ্রেণীর ও সর্বস্তরের প্রতিনিধিত্ব ছিল । এ দলে আমীর যেমন দেখা যায় , তেমনি দেখা যায় ফকীরকেও ।

 বৃদ্ধ যেমন দৃষ্টিগোচর হয় , তেমনি দৃষ্টিগোচর হয় যুবকও । পুরুষ যেমন , তেমনি নারীও এ তালিকায় স্থান পেয়েছে । আর এঁদের অধিকাংশেরই সম্পর্ক ছিল মক্কার বনেদী ও প্রাচীন খান্দানগুলোর সঙ্গে যদ্দ্বারা ইসলামের দাওয়াতের বিরাট প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া এবং এর শক্তি ও বিশালতা সম্পর্কে জানা যায় ।



কুরায়শদের পশ্চাদ্ধাবন।বাধ্য হয়ে পিছু হটলো।

কুরায়শরা যখন দেখতে পেল যে , মুসলমানরা সেখানে পৌঁছে গেছে এবং আরাম ও প্রশান্তির সঙ্গে রয়েছে তখন তারা আবদুল্লাহ ইবন আবী রবী'আ ও ' আমর ইবনু'ল - ' আস ইবন ওয়াইলকে সেখানে পাঠায় এবং তাদের সঙ্গে সম্রাট নাজাশী , যুদ্ধবাজ সর্দার ও সিপাহসালারদের জন্য এমন বহু উপহার - উপঢৌকনও পাঠায় যেগুলোকে মক্কার বিশেষ সওগাত মনে করা হত ।

 এরা দু'জন সম্রাট নাজাশীর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং সম্রাটের সিপাহসালার ও সর্দারদেরকে নানা রকমের উপহার পেশ করে তাদের অনুকূলে টেনে নেয় । সম্রাটের দরবারে এ দু'জন কুরায়শ প্রতিনিধি এভাবে তাদের আলোচনার সূত্রপাত করে :


“ মহানুভব সম্রাটের রাজ্যে আমাদের দেশের কিছু বেওকুফ যুবা ও তরুণ এসে আশ্রয় নিয়েছে । এরা তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করেছে , অথচ তারা আপনার ধর্মও কবুল করেনি , বরং এরা এক নতুন ধর্ম আবিষ্কার করেছে , যে ধর্ম না আমরা চিনি আর না আপনারা চেনেন । আমাদেরকে আপনার নিকট তাদের সম্প্রদায়ের কিছু নেতৃস্থানীয় ও দায়িত্বশীল লোক ( যারা তাদেরই বাপ - চাচা ও নিকটাত্মীয় ) পাঠিয়েছেন যাতে আপনি তাদের ছেলে - সন্তানদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেন । কেননা এদের ব্যাপারে তারাই বেশি ভাল জানে এবং তারাই এদের আপনজন । ” সম্রাটের চারপাশে যেসব সর্দার ছিল তারা সকলেই একবাক্যে বলে উঠল , “ মহানুভব সম্রাট ! এরা দু'জন ঠিকই বলছেন । আপনি তাদেরকে ওদের দু'জনের হাতে তুলে দিন ।


 " নাজাশী তাদের এবম্বিধ কথায় খুবই ক্রোধান্বিত হন । এবং তাদের কথা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান । যারা তাঁর মহানুভবতার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে এসেছে তাদেরকে এভাবে বন্ধুহীন ও স্বজনহীন অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া তিনি পছন্দ করেননি ।


 তিনি এ ব্যাপারে শপথও করেন এবং মুসলমানদের ডেকে পাঠিয়ে খৃস্টান পাদরীদেরকে একত্র করেন এবং মুসলমানদের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন , “ তোমাদের সেই ধর্ম কি যার জন্য তোমরা তোমাদের দেশ ও জাতি পরিত্যাগ করেছ এবং পরিত্যাগের পর তোমরা না আমার ধর্ম গ্রহণ করেছ , আর না অন্য কোন পরিচিত ধর্ম কবুল করেছ ? 



জা'ফর ইবন আবী তালিব ( রা ) -এর ভাষণ।যা ছিলো ভাষণে। 

জাহিলিয়াতের পর্দা উন্মোচন ও ইসলামের পরিচিতি পেশ তখন রাসূলুল্লাহ ( সা ) -এর পিতৃব্য পুত্র জা'ফর ইবন আবী তালিব ( রা ) দাঁড়ান এবং নিম্নোক্ত বক্তব্য পেশ করেন : “ হে রাজা!! আমরা ছিলাম এক জাহিল কওম । আমরা মূর্তিপূজা করতাম । মৃত জীব ভক্ষণ করতাম । সর্বপ্রকার নির্লজ্জতা , অশ্লীলতা ও পাপে আমরা ছিলাম লিপ্ত । 

আমাদের মধ্যে যারা সবল ও শক্তিশালী তারা দুর্বল ও কমযোর লোকদের ছিঁড়ে খেতাম । আমরা এ রকম অবস্থায় ছিলাম । 


এমন সময় আল্লাহ তা'আলা আমাদেরই মধ্যে থেকে একজনকে রাসূল হিসেবে পাঠালেন যাঁর খান্দান বংশমর্যাদায় ও কৌলিন্যে শ্রেষ্ঠ , যাঁর সত্যবাদিতা , আমানতদারী , সচ্চরিত্র ও পবিত্রতা সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই জানতাম । তিনি আমাদেরকে দাওয়াত দিলেন এক আল্লাহ্ ওপর ঈমান আনতে এবং কেবল তাঁরই ইবাদত - বন্দেগী করতে । তিনি আহ্বান জানালেন আমরা ও আমাদের বাপ - দাদা যেসব মূর্তি ও পাথরের পূজা করতেন সেগুলোকে একেবারে ছেড়ে দিতে এবং সে সবের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে । 


তিনি আমাদেরকে সত্য কথা বলতে , আমানত আদায় করতে , আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখতে , প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে , নাজায়েয ও হারাম কথাবার্তা ও না - হক খুন - খারাবী ত্যাগ করে চলতে নির্দেশ দেন । নির্লজ্জ ও অশ্লীল কাজ , মিথ্যা , ধোঁকা ও প্রতারণা , য়াতীমের মাল ভক্ষণ , সতী - সাধ্বী ও পবিত্রা রমণীদের চরিত্রে অপবাদ আরোপ করতে তিনি নিষেধ করেন । তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দেন যেন আমরা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং তাঁর সাথে অপর কাউকে শরীক না করি । তিনি আমাদেরকে সালাত , সওম ও যাকাতের নির্দেশ দেন  ।


 আমরা তাঁকে সত্য বলে মেনেছি , তাঁর ওপর ঈমান এনেছি এবং যেসব তরীকা ও শিক্ষামালা তিনি আল্লাহ্র নিকট থেকে নিয়ে এসেছেন আমরা তার আনুগত্য করি , করি অনুসরণ । আমরা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করি , তাঁর সঙ্গে অপর কাউকে শরীক করি না । তিনি যা হারাম করেছেন আমরা তা হারাম জেনেছি এবং তিনি যা হালাল করেছেন তা হালাল হিসেবে মেনে নিয়েছি । এতে আমাদের জাতিগোষ্ঠী আমাদের শত্রুতা সাধনে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে । 


তারা আমাদেরকে নানা রকমের কষ্ট দেয় এবং আমাদেরকে তাঁর প্রচারিত দীন থেকে বিচ্যুত করবার জন্য বিভিন্ন রূপ পরীক্ষার মাঝে নিক্ষেপ করে । তারা আরও চেষ্টা চালায় যেন আমরা আল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ করি , পুনরায় মূর্তি পূজা শুরু করি এবং যেই সব গোনাহ ও পাপ কাজকে প্রথমে বৈধ মনে করতাম পুনরায় তা বৈধ ও হালাল মনে করি । 


“ যখন তারা আমাদের সঙ্গে জোর - যবরদস্তি করা শুরু করল , আমাদের ওপর জুলুম করল , আমাদের বেঁচে থাকাকে অসম্ভব করে তুলল , আমাদের ধর্মের পথে পর্বতসম বাধা হয়ে দাঁড়াল তখন আমরা আশ্রয় গ্রহণ মানসে আপনার রাজ্যে আসি এবং এজন্য আপনাকেই আমরা নির্বাচিত করি । আপনার প্রতিবেশ ও আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষী হই । 


হে বাদশাহ ! আমরা এখানে এই আশায় এসেছি যে , এখানে আমাদের ওপর কোন জুলুম হবে না । ” নাজাশী এই গোটা বক্তৃতা পূর্ণ নীরবতা ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে শুনলেন এবং বললেন তোমাদের নবী আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার কিছু তোমাদের কাছে আছে ? হযরত জা'ফর ( রা ) উত্তর দিলেন : হ্যাঁ ! আছে । নাজাশী বললেন : আমাকে তা পাঠ করে শোনাও । হযরত জা'ফর ( রা ) সূরা মারয়ামের প্রথম দিকের আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন । 


তেলাওয়াত শুনে নাজাশী কেঁদে ফেললেন এবং চোখের পানিতে তাঁর দাঁড়ি পর্যন্ত ভিজে যায় । সম্রাটের দরবারের পাদরীরা পর্যন্ত কাঁদতে থাকেন । এমন কি তাঁদের ধর্মীয় পুস্তক অবধি চোখের পানিতে ভিজে যায় । হযরত জা‘ফর ( রা ) -এর হেকমত ও অলংকারময় বক্তব্য আবিসিনিয়া অধিপতি নাজাশীর সামনে হযরত জা'ফর ইবন আবী তালিব ( রা ) -এর বক্তৃতা ও ইসলামের দাওয়াত তার হেকমত , স্থান - কালের রে আয়েত ও মানুষের মনস্তত্ব সম্পর্কে অবগতির চিত্তাকর্ষক নমুনা ।


 এ থেকে শাব্দিক অলংকারিতা অপেক্ষাও বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক অলংকারিতা প্রকাশ পায় যাকে ঐশী পথ - নির্দেশনা ( রব্বানী হেদায়াত ) ও গায়বী মদদ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না । উপরন্তু এই বক্তৃতা থেকে হযরত জা'ফর ( রা ) -এর শান্ত প্রকৃতি ও দূরদর্শিতারও পরিচয় পাওয়া যায় যে ক্ষেত্রে বনূ হাশিম কুরায়শদের ওপর এবং কুরায়শ গোত্র সমগ্র আরবের ওপর অগ্রগামী ছিল । 


হযরত জা'ফর ( রা ) তাঁর বক্তৃতাকে আরব জাহিলিয়াতের অবস্থা পেশ করা এবং একথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন যে , রাসূলুল্লাহ ( সা ) -কে আল্লাহ তা'আলা রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন , মানুষকে তিনি আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন এবং দীনে হক - এর দাওয়াত ও সর্বোত্তম চরিত্রের তা'লীম দিয়েছেন । যে সব লোক তাঁর ওপর ঈমান এনেছে তাদের জীবনে বিরাট বিপ্লব সাধিত হয়েছে ।


 এটা অবস্থার এমন বিশ্লেষণ ও চিত্রাংকন যা একটি আত্মজীবনীর মর্যাদা রাখে এবং যার বর্ণনাকারীর সত্যতার ক্ষেত্রে সন্দেহ বা সংশয়ের আদৌ অবকাশ নেই । বিজ্ঞসুলভ দাওয়াত ও বর্ণনা প্রকৃত সত্যের এমন একটি পন্থা বা পদ্ধতি যা উপস্থাপনকারীর জন্য না বিপদ সৃষ্টিকারী আর না সংশয় সৃষ্টিকারী , না বিরোধিতাকারী ও আপত্তি উত্থাপনকারীকে আহত করে এবং না শ্রোতাকে বিরোধিতা করার জন্য উৎসাহিত করার সুযোগ দেয় । 


এটি এমন একটি ব্যাপার যা ঘটনা ও একটি সমাজের সত্যিকার কাহিনী যার মধ্যে একজন নবীর দাওয়াত ও তা'লীম গ্রহণকারীকে মানবতার নিম্নতম অবস্থা থেকে উঠিয়ে উচ্চতম সোপানে পৌছে দিয়েছে । এখন যার ইচ্ছা সে এটাকে পরীক্ষা করে দেখুক এবং এই বৈপ্লবিক অবস্থা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করুক । 



কুরায়শ প্রতিনিধি দলের ব্যর্থতা।কেনো হয়েছিলো।

 নাজাশী ( বক্তৃতা শ্রবণান্তে ) বললেন , নিঃসন্দেহে এটি এবং যা কিছু হযরত ‘ ঈসা ( আ ) নিয়ে এসেছিলেন একই আলোক রশ্মি থেকে উৎসারিত । অতঃপর তিনি কুরায়শ দূতদ্বয়ের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং বললেন : তোমরা এখান থেকে চলে যাও । আল্লাহর কসম ! আমি কখনো এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না । 

এবার ' আমর ইবনু'ল - ' আস তার তুনীরের শেষ তীরটি নিক্ষেপ করল । তীরটি ছিল বিষমাখা । সে বলল : মহান সম্রাট ! এরা হযরত ঈসা ( আ ) সম্পর্কে এমন সব কথা বলে যা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করাও মুশকিল । মুসলমানদের লক্ষ করে সম্রাট নাজাশী জিজ্ঞেস করলেন : তোমরা হযরত মসীহ ( আ ) সম্পর্কে কী বলে থাক ? হযরত জা'ফর ইবন আবী তালিব ( রা ) উত্তরে জানালেন : আমরা তাঁর সম্পর্কে সেই সব কথাই বলি যা আমাদের নবী ( সা ) আমাদেরকে শিখিয়েছেন ।

 আর তা হল , তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল এবং তিনি তাঁর রূহ ও তাঁর বাক্য ( কালেমা ) যা তিনি কুমারী ও পবিত্রা মারয়ামের ওপর নিক্ষেপ করেছিলেন । 


এতদশ্রবণে তিনি তাঁর হাত দিয়ে মাটি থেকে একটি খড় তুলে বললেন : আল্লাহর কসম ! যা কিছু তোমরা বললে হযরত ঈসা ( আ ) এর থেকে এই খড়ের তুল্যও বেশি নন । এরপর সম্রাট মুসলমানদের অবস্থান সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মঞ্জুর করেন এবং তাদেরকে নিরাপত্তা ও অভয় দান করেন । কুরায়শ দূতদ্বয় অত্যন্ত লজ্জিত ও অপমানিত হয়ে সেখানে থেকে বহিষ্কৃত হল আর মুসলমানরা অত্যন্ত উত্তম আবাস ও ভাল পরিবেশে সম্মানজনক স্থান লাভ করল । 


মুসলমানদের কৃতজ্ঞতাবোধের প্রেরণা।যা হয়েছিল। 

 সেই যুগেই নাজাশীর জনৈক দুশমন তাঁর রাজ্যে হামলা চালায় । মুহাজির মুসলমানদের সম্পর্কে সম্রাট নাজাশীর প্রশংসনীয় ভূমিকা এবং তাঁর সদয় ব্যবহারের উত্তরে মুসলমানগণ সম্রাটকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেন যা ছিল ইসলামের নৈতিক শিক্ষামালা মাফিক ও মুসলমানদের চরিত্র উপযোগী । 


আবিসিনিয়ায় দীনের দাওয়াত ও ইসলামের পরিচিতি পেশ।ইসলামের প্রচারণা। 

আবিসিনিয়া অভিমুখে মুসলমানদের হিজরত নবুওয়াতের ৫ ম বর্ষে অনুষ্ঠিত হয় । হযরত জা'ফর ইবন আবী তালিব ( রা ) তাঁর সঙ্গী - সাথীদেরকে নিয়ে হিজরী ৭ ম বর্ষ পর্যন্ত এখানে থাকেন এবং খায়বার যুদ্ধের সময় তাঁরা রাসূলুল্লাহ ( সা ) -র খেদমতে উপস্থিত হন । 


এভাবে তাঁরা পনের বছর আবিসিনিয়ায় থাকেন । এ এক দীর্ঘ সময় যা থেকে হযরত জা'ফর ইবন আবী তালিব ( রা ) ইসলামের দাওয়াতের ধারাবাহিকতায় অবশ্যই ফায়দা লাভ করে থাকবেন । যেহেতু দেশটি অপরাপর খৃস্টান দেশের মুকাবিলায় উদারতা , সহিষ্ণুতা ও নিপীড়িত মজলুমদেরকে আশ্রয় দানের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এবং শাসক তাঁর ন্যায়বিচার ও মানবতাবোধের জন্য পরিচিত ছিলেন , কিন্তু ঐ যুগ ঘটনার বিস্তৃত ও লিখিত বিবরণ ধরে রাখার যুগ ছিল না বিধায় এর সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে যদিও আমাদের নিকট ঐতিহাসিক ও পুঁথিগত দলীল - দস্তাব্যে নেই , কিন্তু অনুমান করা চলে যে , তাঁর এই দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবস্থান থেকে ( যার পেছনে অন্য কোন পার্থিব ফায়দা লাভ লক্ষ্য ছিল না ) দীনের দাওয়াত ও ইসলামের পরিচিতি পেশের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে থাকবেন। 



বিশেষ আলোচনা। কিয়ামাত ও পুনরুত্থান দিবস। 

কিয়ামাত ও পুনরুত্থান দিবসের নির্দিষ্ট একটি সময় রয়েছে । ঐ সময় যখন আসবে , তখন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে । এতে আসমান ফেটে যাবে , চন্দ্র - সূর্য নিষ্প্রভ হয়ে পড়বে , যমীন চূর্ণ - বিচূর্ণ হয়ে যাবে , পাহাড় তুলার মত উড়তে থাকবে , সাগর - মহাসাগর শুকিয়ে যাবে এবং সমগ্র সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাবে । প্রথমবার শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার পর জীবিতরা মারা যাবে । এরপর পুনরায় শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার পর সকলে জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে । 


পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : ونفخ في الصور فصعق من في السموت ومن في الأرض الأ من شاء الله ثم نفخ فيه أخرى فاذا هم قيام ينظرون . শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে , ফলে যাদেরকে আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন তারা ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলে মূর্ছিত হয়ে পড়বে । তারপর আবার শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে , তখনই তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে । ( সূরা যুমার , ৩৯ : ৬৮ ) ময়দানে হাশরে বান্দাদের আমলের হিসাব হবে । নেকী - বদীর ওজন হবে । 


নেক্কার লোকদের ডান হাতে এবং বদকার লোকদের বাম হাতে আমলনামা প্রদান করা হবে । বিচারের ময়দানে একটি সূক্ষ্ম সেতু থাকবে । একে ‘ সিরাত ' বলা হয় । ঐ সেতু তরবারির চেয়েও তীক্ষ্ণ ও ধারাল এবং চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম হবে । এর উপর দিয়ে সকলকে পথ অতিক্রম করতে হবে । পাপী লোকেরা তা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না । তারা হাত - পা কেটে জাহান্নামে পতিত হবে । আর নেক্কার লোকেরা আল্লাহর অনুগ্রহে অতি সহজে ঐ সেতু অতিক্রম করতে সক্ষম হবে । পুলসিরাত অতিক্রম করার পর নেক্কার বান্দাগণ ‘ হাউযে কাওসার ' হতে শরবত পান করবেন । একবার যিনি এই শরবত পান করবেন তিনি আর কখনো পিপাসিত হবেন না ।


 এ শরবত দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি হবে । Wy কিয়ামাত ও পুনরুত্থান সম্বন্ধে পূর্বে যে বিবরণ পেশ করা হয়েছে কুরআন ও হাদীসে এ সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে । কিয়ামাত অবশ্যাম্ভাবী । এ সম্বন্ধে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে : ثم انك يوم القيمة تبعثون . তারপর কিয়ামাতের দিন তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে । ( সূরা মু'মিনূন , ২৩ : ১৬ ) ৯৬ অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে : منها خلقنكم وفيها نعيدكم ومنها تخرجكم تارة أخرى - আমি মাটি হতে তোমাদের সৃষ্টি করেছি এবং তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে দিব , আবার মাটি হতেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করব । (


 সূরা ত্বাহা , ২০ : ৫৫ ) কিয়ামাত ও পুনরুত্থান প্রসঙ্গে যুক্তি পেশ করে বলা হয় যে , যদি পুনরুত্থান এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রতিফল তথা পুরস্কার বা তিরস্কারকে স্বীকার না করা হয় তবে ভালমন্দ এবং নেকী বদীর স্বাভাবিক তারতম্য মূল্যহীন এবং মানব জীবন উদ্দেশ্যহীন হয়ে যায় । অথচ আল্লাহ্ তা'আলা এ জগতে মানব জাতিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি ।

\


 কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে : 3 افحسبتم انما خلقنكم عبثا وأنكم الينا لا ترجعون . তোমরা কি মনে করেছ যে , আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না ? ( সূরা মু'মিনূন , ২৩ : ১১৫ ) মরার পর মানুষ পচে - গলে মাটির সাথে মিশে যাবে তখন এ মানুষকে পুনরায় কেমন করে জীবিত করা হবে । এ জাতীয় প্রশ্ন করা একেবারেই অবান্তর । করআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে :।


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post